রেনু পোনার সূতিকাগার চাঁচড়ায় আবারো ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। নাওয়া খাওয়া ভুলে মৎস্য চাষি-ব্যবসায়িরা নতুন মৌসুম শুরু করেছেন। প্রতিদিন চাঁচড়া ও বাবলাতলায় কোটি কোটি টাকার রেনু পোনা বিক্রি হয়। বাংলা চৈত্র মাসে প্রতিবছর এখানে মৎস্য মৌসুম শুরু হয়। মৎস্য হ্যাচারিগুলোতে ডিম রেনু উৎপাদন শুরু হয়েছে। পুকুরগুলো তৈরি করা হচ্ছে পুরো মৌসুমের জন্য।
যশোরের চাঁচড়া গ্রামের মানুষ মাছের পোনা উৎপাদনে নীরব বিল্পব ঘটিয়েছেন। চাঁচড়া ছাড়াও আশেপাশের এলাকায় প্রায় শত হ্যাচারি আর হাজার নার্সারি প্রতিষ্ঠা করে প্রতি বছর ২শ’ কোটি টাকার রেণু পোনা উৎপাদন করছেন এ এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন ¯’ানীয় বাজারে ৫০ লাখ টাকার পোনা বিক্রি হয়। দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পোনা উৎপাদন করে এলাকাবাসী নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি আমিষের ঘাটতি পূরণে আনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছেন। এখানে উৎপাদিত ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার পোনা প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী দেশে চালান হয়ে যাওয়া মাছ চাষে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ১ লাখ মানুষ এ পেশায় যুক্ত হয়ে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, মাগুর, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, মিনার কার্প, পাবদা, গুলশা, রিটা, রালক কার্প, মিরর কার্পসহ অন্যান্য সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করে চাঁচড়ার চেহারা বদলে দিয়েছে।
পোনা উৎপাদনে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। মৎস্য পল্লী গড়ে তোলা, ব্রুড ব্যাংক (পোনা ব্যাংক) প্রতিষ্ঠা, আধুনিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ, আধুনিক পোনা বাজার ¯’াপন করা-এ দাবিগুলো আংশিক বাস্তবয়িত হওয়ায় পোনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতরা হতাশ।
চাঁচড়া মৎস্যপল্লী : যশোর শহরের দক্ষিণে চাঁচড়া। গ্রাম ও ইউনিয়নজুড়ে মৎস্য হ্যাচারি ও নার্সারি। পৌরসভা আর ইউনিয়ন নিয়ে গ্রাম গঠিত। যশোর রেলস্টেশনের দক্ষিণ থেকে চাঁচড়া শুরু। ৪ কিলোমিটার পর দক্ষিণ পূর্বের রাজবংশী বর্মণপাড়ায় গ্রাম শেষ। কয়েক বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ গ্রামে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। ইতিহাস বিখ্যাত চাঁচড়া রাশবংশের ধ্বংস হওয়া রাজবাড়ী। কাক ডাকা ভোরেই চাঁচড়া জেগে ওঠে। যশোর-বেনাপোল সড়কের ডালমিলে পাকা সড়কের দুই ধারে বিরাট বিরাট এ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি নিয়ে মাগুর পোনা বিক্রি করেন শত শত মানুষ। পাশাপাশি চাঁচড়া মোড়, কামারখালি মোড়, পাওয়ার হাউস এলাকা বাবলা তলায় ‘হাপা’য় বিক্রি হয় মাছের পোনা। ভোরের আলোয় ছোট ছোট রুই-কাতলার ঝাঁক রূপার মতো চকচক করে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার ক্রেতা মাছের রেনু পোনা কিনতে আসেন। কোটি কোটি রেনু-পোনা কেনাবেচা হয়। বাস, ট্রাক, পিকআপ বোঝাই হয়ে সে মাছ চলে যায় ঢাকা, বরিশাল, সিলেট, ফরিদপুর সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। জাল, মাছের খাবার, ব্যারেল ভর্তি পোনা নিয়ে ছোটে মানুষ। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত এলাকার সর্বত্র একই দৃশ্য চোখে পড়ে।
দীর্ঘদিন পর চাঁচড়া সবজীবাগের শেখ মহসিন আলী পঞ্চাশের দশকে নদী থেকে রেণু (ডিম) সংগ্রহ করে নার্সারি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পোনা উৎপাদন শুরু করেন। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত তিনি এককভাবে পোনা উৎপাদনের কাজ করেছেন। পরবর্তীতে মাছের অব্যাহত চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এলাকার বহু মানুষ এ পেশায় যুক্ত হন। মহসিন আলীর পুত্র হাফেজ শেখ বাহারউদ্দিন ১৯৮২ সালে হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হন। বাহউদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত সেনালী মৎস হ্যাচারিই হচ্ছে বাংলাদেশের বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত প্রথম হ্যাচারি। বাহাউদ্দিনের সফলতা দেখে ১৯৮৩ সালে তার বড় ভাই শেখ মেজবাউদ্দিন, কারবালার শামসুল ইসলাম হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর চাঁচড়ার মোস্তফা কামাল, সাইফুজ্জামান মজু, ফিরোজ খানসহ আরও অনেকে রেণু উৎপাদনের জন্য হ্যাচারি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন। যশোরের মৎস্য প্রবাদ পুরুষ মহসিন মাস্টার, বাহাউদ্দিন, মোস্তফা কামাল আজ মৃত। চাঁচড়ায় এখন ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় শত হ্যাচারী। এ সব হ্যাচারীতে প্রায় ৫০ হাজার কেজি রুই জাতীয় সাদা মাছের ডিম (রেণু) উৎপাদিত হচ্ছে। ৩০টি হ্যাচারিতে বছরে অন্তত: ৩০/৩৫ হাজার কেজি পাঙ্গাস মাছের পোনা উৎপাদিত হয়। এসব হ্যাচারির ডিম নিয়ে পাঁচ হাজার নার্সারিতে মৎস্য পোনা উৎপাদিত হয়। বর্তমানে এ ব্যবসায় দুই লাখ মানুষ সম্পৃক্ত।
ডালমিল এখন মাগুর পট্টি। চাঁচড়া ডালমিল পার হয়ে সরু যে পীচের রাস্তা চাঁচড়া মোড়ে গিয়ে মিশেছে তার এখন নাম মাগুর পট্টি। রাস্তার দুইধারে প্রায় ৫০০ গজ জুড়ে গড়ে উঠেছে পোনা মাগুর বাজার। হাজার মানুষ এই বাজারে মাছ কেনা বেচায় যুক্ত। এখানে মাগুর, চিতল, কৈ পোনা বিক্রি হয়। ১৯৯০ সালে মাগুর পোনা উৎপাদন শুরু হলে ১৯৯২ সালে এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। এখন প্রতি বছর মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘পিক সীজনে’ এই বাজারে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা মূল্যের ৫০ লাখ থেকে ১কোটি মাগুর পোনা বিক্রি হয়।
পাঙ্গাস যেন আশীর্বাদ : চাঁচড়া এলাকার হ্যাচারি মালিকরা কখনও কল্পনা করেননি রুই মাছের পাশাপাশি পাঙ্গাস মাছের ডিম উৎপাদন সম্ভব। এই পাঙ্গাস হ্যাচারি মালিকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে। পাঙ্গাস মাছের রেণু উৎপাদন করে ইতোমধ্যে অনেক হ্যাচারি মালিক লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। পুকুরে পাঙ্গাস মাছের চাষ ১৯৯০ সালে শুরু হয়। থাইল্যান্ড থেকে পাঙ্গাসের পোনা আমদানি হয় প্রথম। ১ ইঞ্চি সাইজের পোনার দাম ৫ টাকাও প্রথমে বিক্রি হয়েছে। আবহওয়াগত কারণে বেশির ভাগ পোনা মরে যায়। এমন অব¯’ায় চাঁচড়া ডালমিল এলাকার শুভ্র মৎস্য হ্যাচারির মালিক সাইফুজ্জামান মজু ও ফিরোজ খান ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এফআরআই (মৎস গবেষণ কেন্দ্র) থেকে ১২৫টি পাঙ্গাসের ‘ব্রুড ফিস’ আনেন। এই মাছের ডিম দিয়ে তারা চেষ্টা তদবিরের পর ১৯৯৫ সালে ১৩ হাজার পোনা উৎপাদনে সক্ষম হন। ১৯৯৬ সালে শুভ্র হ্যাচারিতে লাখ লাখ পোনার জন্ম হলে স্থানীয় হ্যাচারি মালিক শেখ বাহারউদ্দিন, শেখ মেজবাউদ্দিন, শামসুল ইসলামসহ আরো অনেকে পাঙ্গাসের ডিম উৎপাদনে এগিয়ে আসেন। বর্তমানে ৪০ হ্যাচারিতে বছরে গড়ে ৩০কোটি পাঙ্গাসের পোনা উৎপাদিত হয়। হ্যাচারি থেকেই প্রতিকেজি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫/৬ হাজার টাকায়। পোনা বিক্রি সাইজ বুঝে প্রতি হাজার ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। বাজারে পাঙ্গাস পোনার মূল্য বেশী বলে এখন অনেকেই নার্সারিতে রেণু লালন-পালন করে বিক্রি করেন।








