- জাতীয় আয়ে কৃষিখাতে অবদান কম: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
- কৃষিতে ঋণদান ৩ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ: বাংলাদেশ ব্যাংক
- ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে তরুণরা কৃষিতে যাবে না: শাকিরুল হক, কৃষি উদ্যোক্তা
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনে সশরীরে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে গণভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে বৈশ্বিক মন্দার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি। তারপর থেকে প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলা করতে কৃষি কাজের দিকে মনোযোগ আকর্ষণসহ প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদে আনতে উৎসাহ দিচ্ছেন। মন্দার কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির নাজেহাল অবস্থাকে তুলে ধরছেন।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হলেও শিল্পের দিকে এখন গতি বেশি। এই কৃষি ব্যবস্থা যদিও শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস কিন্তু বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। বরং শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানিতেই ব্যবসায়ীদের ঝোঁক বেশি। আর বাস্তবেও তাই করছে। সেক্ষেত্রে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা যা আয় হয় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আমদানি করতে হয়। আবার কৃষিখাতে ঋণও আশানুরূপ নয়। নেই ফসলের ন্যায্যমূল্য। ফলে কৃষিতে তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকছে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সেমিনারে জানানো হয় ১৯৭১ সালে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার। আর সেটি ২০১৮ এসে দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারে। অর্থাৎ ৪৭ বছরে কমেছে ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ৮ম। এখানে প্রতি কিলোমিটারে এক হাজার ২৬৫ জনের বাস। ঘনত্বের পরিমাপে জলাভূমি ২০, বনভূমি ১৭ দশমিক ৪ ও কৃষিভূমি ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশের হিসেবে ঘনত্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ১৯৮০ সালে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল দেশের মোট জমির ৬৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এটি কমে ২০১৯ সালে এসে ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সেই হিসেবে ৩৯ বছরে কমেছে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। ভূমি জরিপ বিভাগের তথ্য মতে, ১৯৭১ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ হেক্টর। ২০০৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টরে। গত ৩২ বছরে আবাদি জমি কমেছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর। পরের ১৮ বছরে এর পরিমাণ আরো কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অব ইন্টারেস্ট রেট ক্যাপস অ্যান্ড পোটেনশিয়াল পলিসি অপশনস: বাংলাদেশ পারসপেক্টিভ’ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ, শিল্পখাতে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ, শিল্পখাতে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৯ দশমিক শূন্য শতাংশ, শিল্পখাতে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ, শিল্পখাতে ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১৯দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, শিল্পখাতে ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, শিল্পখাতে ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ, শিল্পখাতে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ, শিল্পখাতে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, সিএমএসএমইখাতে ২৭ দশমিক ১ শতাংশ, শিল্পখাতে ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ ও অন্যান্যখাতে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি অর্থবছরেই ৩ শতাংশ ঋণ দেয়া হয়েছে সর্বনিম্ন। অথচ কৃষিখাতে কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ।
চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি ও কর্মসংস্থান জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তি ৬৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও নারী ২০ শতাংশ। কৃষিতে ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, শিল্পে ২০ দশমিক ৪, সেবায় ৩৯ ও বেকারত্বের হার ৪২ দশমিক ২ শতাংশ। ৮ নভেম্বর পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমকে কৃষিতে গত ৯ বছরে ৩ শতাংশের সামান্য বেশি ঋণ দেয়া হয়েছে। অথচ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পে ৩০ থেকে ৫৬ শতাংশ ঋণ দেয়া হচ্ছে। কৃষিতে কর্মসংস্থান বেশি হওয়ার পরও ঋণ কম কেন প্রশ্ন করা হয়।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, কৃষি নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। তবে চাহিদার আলোকে ঋণ এই খাতে খুব কম। এ সময় প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, কৃষিতে জাতীয় আয়ে অবদান কম। সেজন্য ঋণও কম দেয়া হয়। আর কৃষিতে তো ভর্তুকি দেয়া হয়। শিল্পে ভর্তুকি দেয়া হয় না।
কয়েকজন তরুণ কৃষকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, কৃষিখাতে ঋণ পাওয়া যায় না। যে ঋণগুলো সেগুলোও বড় বড় এগ্রোফার্ম নিয়ে যায় সাধারণ কৃষকরা এক্ষেত্রে শুন্য হাতে ফিরে। প্রধানমন্ত্রী কৃষি কাজের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন কিন্তু কোন দিকনির্দেশনা। আর কৃষিখাতে কাজ করেই বা মানুষ কি করবে? দেশেও ফসলের ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা স্বাভাবিক দামও পাওয়া যায় না। অথচ অন্য দেশ থেকে সেই পণ্য কিনে এনে দশ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।
উদাহারণ হিসেবে মন্ত্রী বলেন, এ বছরের শুরুর দিকে কাঁচামরিচের সংকট দেখা দিলে ভারত থেকে এনে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। অথচ তার কিছু দিন পর দেশে উৎপাদিতগুলোর দাম এসে পড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এই অবস্থা। এম এ মান্নান বলেন, বীজ, সার, কীটনাশক থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। শ্রমিকের বেতন, কৃষকের শ্রম সব হিসেব করলে কৃষি কাজে কিছুই থাকে না। এখন গ্রামেও কাজ নেই। মানুষ কৃষিতে প্রাণ ফিরে পায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে এসে কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন শাকিরুল। তিনি বলেন, ৫ হতে ৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে ফসলের দাম নেই। বাধ্য হয়ে বাদ দিয়ে আবার চাকরিজীবনে ফিরে এসেছি। তিনি বলেন, কৃষিতে মনোযোগ আকর্ষণ করতে হলে প্রথম ও প্রধান কাজ হবে রাষ্ট্রকে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
আগামীতে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা ও উত্তরণে ৬ নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বলা হয়, বৈশ্বিক সংকটের ফাঁদেপড়ে দেশে যাতে কোনো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেটি নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ৬টি নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনাগুলো হলো- ১. খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, ২. বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে হবে, ৩. রেমিট্যান্স পাঠাতে ফি লাগবে না, ৪. সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ৫. বিনিয়োগ তহবিল প্রত্যার্পণ সহজতর করতে হবে এবং ৬. পর্যাপ্ত খাদ্যমজুত রাখতে হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ক্রপ প্রসপেক্টস অ্যান্ড ফুড সিচুয়েশন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আছে ৯টি দেশ, যার মধ্যে বাংলাদেশসহ তিনটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার।
ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেইজ ক্ল্যাসিফিকেশনের (আইপিসি) সম্প্রতি প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন মধ্যম ও গুরুতর মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যা মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ। আগস্টে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম-ডব্লিউএফপি পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে গত ১৩ অক্টোবর ‘বাংলাদেশ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড ভালনারাবিলিটি মনিটরিং রিপোর্ট’ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে ২২ শতাংশ পরিবার মাঝারিমানের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছে। নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে ৪২ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। এ ধরনের পরিবারে পুষ্টিরও অবনতি হয়েছে।









