বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করতে পছন্দ করেন বয়স্ক, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের প্রধান উপকরণ ছিপ। আর বড়শির এ ছিপ তৈরি করে স্বাবলম্বী ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার একটি গ্রামের বহু পরিবার। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও ছিপ তৈরি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন।
ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন ইউনিয়নের এ গ্রামটির নাম বাদেমাঝিরা। জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার পথ পেরোলেই দেখা মেলে এ গ্রামের। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে বাড়ির আঙিনায় আগুন জ্বেলে ছ্যাঁকা হচ্ছে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রধান উপকরণ ছিপ। নারী-পুরুষ-কিশোর নির্বিশেষে সবাই যুক্ত এ কাজের সঙ্গে। একসময় দিন আনি, দিন খাই অবস্থা ছিল এ গ্রামের অনেক মানুষের। তখন তারা সবাই নির্ভরশীল ছিলেন অন্যের জমি চাষাবাদের ওপর। এখন ছিপ বানানোর কুটিরশিল্প ভাগ্য খুলে দিয়েছে তাদের। পাল্টে গেছে তাদের জীবনযাপনের মান।
ছিপ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এ গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক পরিবার জড়িত। বস্তুত এ গ্রামের প্রায় সকল মানুষই কোনও না কোনওভাবে ছিপ তৈরি ও বিক্রির কাজে যুক্ত। বংশ পরম্পরায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হাতে-কলমের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন তারা। ছিপ তৈরি করে সরাসরিও বিপণন করছেন অনেকে। এখানকার তৈরি ছিপ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা হয়। উত্তরবঙ্গে এ ছিপের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে ছিপ তৈরির কঞ্চে বাঁশ ক্রয় করে আনেন তারা। এরপর বাঁশ চেছে, ছেক দিয়ে আকা-বাঁকা সোজা করা হয়। ছিপের বাঁশ চাছার কাজে যুক্ত গৃহবধূ খাদিজা, হাসিনা, শারমিন, নাসিমা, তানজিলা ও স্কুল ছাত্রী রুবি জানান, সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি ছিপ চাছার কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। প্রতিটি বাঁশ চেছে মজুরি পান এক টাকা করে। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ বাঁশ চাছা যায়।
ছিপের বাঁশ আগুনে ছেকে সোজা করার কাজে যুক্ত রুবেল, শরাফত, কালু মিয়া জানান, প্রতিটি ছিপ তৈরি করে মজুরি পাওয়া যায় আট থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। বাদেমাঝিরা গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলের সূচনা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা চাঁন মাহমুদ ওরফে চাঁন মিয়ার সুবাদে। বছর পঞ্চাশেক আগে ছিপ বানাতে শুরু করেন তিনি। পর্যায়ক্রমে গ্রামের সবাই উৎসাহিত হয়ে এ কাজের শিক্ষা নেন তার কাছ থেকে। যুক্ত হয় এ কুটিরশিল্পে।
চাঁন মিয়া বলেন, তখন আগুন জ্বালিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ফুঁ দিয়ে বাঁকা বাঁশ সোজা করে ছিপ বানাতাম। এখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ছিপ সেঁকা হয়। কাজকর্ম অনেক সহজ হয়ে গেছে।
বাঁশ ক্রয় ও ছিপ বিক্রির পাইকার আমিনুল ইসলাম জানান, শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এ গ্রামে টিকে আছে শিল্পটি। সারাবছর এখানকার তৈরি ছিপের চাহিদা থাকলেও আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস এর ভরা মৌসুম। সারাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে এ গ্রাম থেকে ছিপ কিনে নিয়ে যান।
মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মনসুর বাদেমাঝিরা গ্রামের মানুষের প্রশংসা করে বলেন, তাদের তৈরি মাছ ধরার এ ছিপ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে তাদের অবস্থা পাল্টেছে। এ গ্রামের কুটিরশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে।
আনন্দবাজার/শহক








