কক্সবাজারে নীল কাঁকড়া চাষ---
দেশি-বিদেশে বাড়ছে চাহিদা
নীল কাঁকড়া সাগরের ভূ-রাসায়নিক, জৈবিক ও জলবায়ু প্রকৌশলী
বাস্তুতন্ত্রের খাদ্য জালগুলিতে পরিবেশগত সংযোগ তৈরি করে। মাটির জৈব পদার্থের বণ্টন পরিবর্তন ঘটায়। পলিতে থাকা বিভিন্ন প্রাণীর খাবার উন্মুক্ত করে, খাবারের গুণগত পুষ্টিমান বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া মাটিতে লবণাক্ত কমায় এবং পানিতে কার্বন সরবরাহের মাধ্যমে অগভীর সামুদ্রিক জলজ পরিবেশের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে নীল কাঁকড়া।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) রেড লিস্টের ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা বাংলাদেশের পরিবেশে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ের তালিকায় থাকা নীল সাতারু কাঁকড়া বা ব্লু সুইমিং ক্রাবের পোনা উৎপাদনে বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছেন কক্সবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। বিএফআরআই মহাপরিচালকের মতে, খামারিরা চাইলে বিএফআরআই থেকে নীল কাঁকড়ার পোনা সংগ্রহ করতে পারবেন।
মূলত, বেশি চাহিদার কারণে বিলুপ্তপ্রায় নীল কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনে বাণিজ্যিক সফলতা কাঁকড়াচাষিদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সুস্বাদু এ কাঁকড়ার স্থানীয় পর্যায়ে এবং বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকার ফলে অর্থকরী এ কাঁকড়া উৎপাদনে আরো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে শীলা কাঁকড়ার পাশাপাশি নীল কাঁকড়া গ্রেড অনুযায়ী স্থানীয় রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। জনপ্রিয় সি-ফুড হিসেবে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। সে কারণে বাণিজ্যিকভাবে পোনা উৎপাদনে সাফল্য খামারিদের জন্য বিরাট এক সুখবর।
অন্যদিকে, স্থানীয় ও বিদেশে রপ্তানির ফলে চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছেন নীল কাঁকড়ার। ফলে কাঁকড়ার আহরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন কমে আসছে। অথচ এ কাঁকড়া সমুদ্র উপকূলের দূষণ পরিষ্কারকারী ‘মেইন বায়োটার্বেটর’ বা জৈব রাসায়নিক পরিবর্তনকারী প্রধান প্রাণী হিসাবে বিবেচিত। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা বলছেন, নীল কাঁকড়া একটি নিখুঁত ও অবিকল্প পরিবেশ প্রকৌশলী। একটি নিখুঁত স্থপতি, ভূ-রাসায়নিক প্রকৌশলী, জৈবিক প্রকৌশলী, ভৌত প্রকৌশলী ও জলবায়ু প্রকৌশলী। ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের খাদ্য জালগুলিতে একটি মূল পরিবেশগত সংযোগ তৈরি করে। মাটিতে থাকা জৈব পদার্থের বণ্টন পরিবর্তন ঘটায়। পলিতে থাকা বিভিন্ন প্রাণীর খাবার উন্মুক্ত করে, খাবারের গুণগত পুষ্টিমান বাড়িয়ে তুলে। এছাড়া মাটিতে লবণাক্ত কমায় এবং পানিতে কার্বন সরবরাহের মাধ্যমে অগভীর সামুদ্রিক জলজ পরিবেশের পানির কলামে রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান দৈনিক আনন্দবজারকে বলেন, কাঁকড়া বায়োটার্বেশনের মাধ্যমে মাটির ভৌত ও জৈব-রাসায়নিক গুণাগুণের বা বৈশিষ্টের পরিবর্তন ঘটিয়ে খাদ্য সার্কেলের বিভিন্ন জীব-অণুজীব ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি করে। সৈকতের মাটির লবণাক্ততাও হ্রাস করে। অপরিকল্পিতভাবে প্রকৃতি থেকে কাঁকড়া আহরণের কারণে পরিবেশ থেকে এসব উপকারী প্রাণি হারিয়ে যেতে বসেছে।
ড. শফিকুর রহমান আরো বলেন, অতি আহরণ থেকে সমুদ্র সম্পদের সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে চলমান ২০২১-২২ অর্থসালে বিএফআরআই’র উদ্যোগে কক্সবাজারে নীল সাতারু কাঁকড়ার প্রজনন ও পোনা উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এরই অংশ হিসাবে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ইতোমধ্যে তিন ব্যাচে সাতারু কাঁকড়ার ডিম থেকে পোনা ফোটানো হয়েছে। সেই বাচ্চ এখন কেন্দ্রের হ্যাচারিতে প্রতিপালিত হচ্ছে।
নীল কাঁকড়ার প্রজনন ও পোনা উৎপাদন প্রকল্প এর প্রধান গবেষক, সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আহমেদ ফজলে রাব্বি বলেন, প্রত্যেক ব্যাচে প্রায় তিন লাখ করে পোনা দিয়েছে। এরমধ্যে ডিসেম্বরে প্রথম ব্যাচের পোনা এখন ক্র্যাবলেট পর্যায়ে এবং গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া তৃতীয় ব্যাচের পোনা জুইয়া-২ পর্যায়ে ও গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া দ্বিতীয় ব্যাচের পোনা জুইয়া-৩ পর্যায়ে রয়েছে। পোনাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে এখনও প্রায় ৬০ ভাগ পর্যন্ত বেঁচে আছে। যা বিজ্ঞানীদের মাঝে বিশাল প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সমুদ্র সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য কক্সবাজারে নীল কাঁকড়ার প্রজনন ও পোনা উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিদেশে শীলা কাকঁড়ার পাশাপাশি নীল সাতারু কাঁকড়ার জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, নীল কাঁকড়ার স্বজাতীভূজী স্বভাব তুলনামূলক কম থাকার কারণে তার পোনা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা সহজ। এই অবস্থায় সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও অতি আহরণ থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং দেশের সুনীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য নীল কাকঁড়ার বাণিজ্যিক প্রজনন কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। খামারীরা চাইলে বিএফআরআই থেকে নীল সাতারু কাকঁড়ার পোনা সংগ্রহ করতে পারবেন।








