কয়েক বছর আগে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় উঠে এসেছিল দেশে মোট জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক চার মিলিয়ন হেক্টর। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো বছরে বাড়ছে প্রায় ২২ লাখ মানুষ। বিপরীতে কমছে দুই লাখ একর কৃষি জমি। এ বিপুল পরিমাণ মানুষের খাদ্য চাহিদা যোগান দেয়া কৃষি সংশ্লিষ্টদের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইতোমধ্যেই উচ্চ ফলনশীল অনেক নতুন জাতের ধান উদ্ভাবিত হয়েছে।
এমন একটি ধান জাতের নাম ‘ফাতেমা’। যা প্রতিবিঘায় ৫০ মণ হারে ফলন দিতে পারে। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌর এলাকার মাহবুবুর রহমান দুলাল নামে এক কৃষক নওগাঁর মান্দা এলাকা থেকে ধানটি সংগ্রহ করে বীজতলা তৈরি করেছেন। মাহবুবুর রহমান দুলাল একাধারে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ, পবা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, দৈনিক যায়যায় দিনের পবা প্রতিনিধি ও স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত দৈনিক সানশাইনের সিনিয়র রিপোর্টার।
কৃষক মাহবুবুর রহমান দুলাল জানান, নওগাঁ অঞ্চলে ‘ফাতেমা’ জাতের ধানটি সাড়া ফেলেছে ব্যাপক। জেলার মান্দা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক কৃষকের চাষ করা ‘ফাতেমা’ জাতের ধান ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দেশে উৎপাদিত প্রচলিত জাতের ধানের চেয়ে এ ধানের ফলন প্রায় তিনগুণ।
তিনি আরো জানান, মান্দা উপজেলার গনেশপুর ইউনিয়নের দোশতীনা গ্রামের সৌখিন কৃষক অ্যাডভোকেট আশরাফুল ইসলাম বশির সম্প্রতি সময়ে মারা গেছেন। তিনি ওই বশিরের কাছ থেকে ৫ কেজি ধান সংগ্রহ করেছেন।
মরহুম অ্যাডভোকেট আশরাফুল ইসলাম বশিরের বরাত দিয়ে মাহবুবুর রহমান দুলাল জানান, দেখতে ব্রি-২৮ ধানের মতো ‘ফাতেমা’। আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই এ ধানের চাষ করা যায়। তবে বোরো মৌসুমে এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। গাছের উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট, যা অন্য ধানের তুলনায় বেশি। গাছগুলো শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না।
আর এক একটি ধানের শীষে ৭৫০ থেকে ১০০০টি করে ধান হয়। সাধারণ ধানের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। ফলে এর উৎপাদনও অনেক বেশি। মরহুম অ্যাডভোকেট বশির চলতি মৌসুমে তিনি দেড় বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫ মণ ধান পেয়েছিলেন। এধানে রোগ ও পোকামাকড়ের হার তুলনামূলক কম। এছাড়া চাল খুব চিকন ও ভাতও খেতে সুস্বাদু।
মাহবুবুর রহমান দুলাল আরো জানান, বীজতলা তৈরি করার পর ১৫০ থেকে ১৫৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা যায়। এ ধান ঝড়, খড়া এবং লবণাক্ততা সহনীয়। ওই জাতের প্রতিটি ধানগাছের দৈর্ঘ্য ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার, গুছি গড়ে আটটি, প্রতিটি ধানের ছড়ার দৈর্ঘ্য ৩৬ সেন্টিমিটার, গড়ে দানার সংখ্যা এক হাজারের ওপরে।
বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের চাকুলিয়া গ্রামে লেবুয়াত শেখ (৪০) নিজেদের জমিতে ২০১৬ সালে প্রথম ওই ধান চাষ করেন। ওই বছর বোরো মৌসুমে তাঁর বাড়ির পাশে জমিতে হাইব্রিড আফতাব-৫ জাতের ধান কাটার সময় তিনটি ভিন্ন জাতের ধানের শীষ তিনি দেখতে পান।
ওই তিনটি শীষ অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বড় এবং শীষে ধানের দানার পরিমাণও অনেক বেশি ছিল। এরপর ওই ধানের শীষ তিনটি বাড়িতে এনে শুকিয়ে বীজ হিসেবে ব্যবহার করে এ ধান চাষ শুরু করেন। তিনি তার মায়ের নামানুসারে নাম না জানা এই ধানের নাম রাখেন ‘ফাতেমা ধান’। সেখান থেকেই মরহুম অ্যাডভোকেট বশির বীজ সংগ্রহ করেছিলেন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এত অধিক ফলনশীল জাতের ধান দেশের আর কোথাও আছে বলে তাদের জানা নেই। ‘ফাতেমা’ জাতের এই ধান কোন জাতের এবং কোথা থেকে কিভাবে এলো এসব জানতে গবেষণার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।
আনন্দবাজার/এম.আর









