আমাদের সমাজে নারী অধিকার যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। ঘরে বাইরে সর্বত্রই নারীরা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। যা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। যদিও এ ব্যাপারে আইন অনেক হয়েছে। কিন্তু সে আইনে কাজ তেমন হচ্ছে বলে মনে হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ধরন ভিন্ন হওয়ায় তা কোনো আইনের আওতাতেই আসে না। নীরবেই নারীরা তা সহ্য করে যায়। লড়াই চালিয়ে যেতে হয় নীরবেই। এমনই খবর প্রকাশ করেছে দৈনিক আনন্দবাজার। শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় নারী কত অজানা নির্যাতনের বেড়াজালে কতটা অসহায়। মানসিক কত অত্যাচারে অত্যাচারিত। প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম "নারীর নীরব লড়াই"। এই সংবাদের নিচেই ছাপা হয়েছে সংগঠন আঁচলের সমীক্ষা রিপোর্ট ‘বাসেই আক্রান্ত ৮৪ ভাগ তরুণী’। দুটি সংবাদেই আমাদের দেশের নারী নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
আঁচল ফাউন্ডেশন নামের সংগঠনটি তাদের সংবাদ সম্মেলনে দেশে তরুণীরা কীভাবে, কোথায় নিপীড়ন নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে তার একটি বিস্তারিত জরিপ প্রকাশ করেছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। অথচ বাংলাদেশের ১১ কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে ৫ কোটির বেশি হচ্ছে নারী। কর্মবাজারে সক্রিয় নারী ২ কোটি। বাকি ৩ কোটি কর্মবাজারে যুক্ত হলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। আর সে কারণে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন জরুরি। পরিবার এবং সমাজে নারী নির্যাতন বা উপেক্ষার শিকার হলে মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। যার ফলশ্রুতিতে কাজ বা প্রতিভা বিকাশ ঘটে না। স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আমরা অনেকক্ষেত্রেই সেটা বুঝতে চাই না। প্রতি পদে পদে নারীদের নির্যাতন বা হয়রানির শিকারে পরিণত করি। আর এটা যে শুধু পুরুষ দ্বারাই হচ্ছে তা কিন্তু নয়। নারীর হাতেও নারী নির্যাতনের ঘটনা আমাদের দেশে কম নয়। পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। এর বাইরেও একশ্রেণির নারী নারীদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার। ঘরে শাশুড়ির দ্বারা বৌ নির্যাতন আবার বৌ-এর দ্বারা শাশুড়ি নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর আমরা প্রায়শই দেখে থাকি।
যা বর্তমান সমাজে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। নারী নির্যাতনের এই সম্পাদকীয় যে সময়ে লেখা হচ্ছে ঠিক সে দিনই খোদ ঢাকা শহরেই ঘটেছে এক লোমহর্ষক ঘটনা। গৃহকর্ত্রীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার এক গৃহকর্মীকে পুলিশ উদ্ধার করে শেখ হাসিনা বার্ন হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অবর্ণনীয় নির্যাতনের কাহিনি শুনলে শরীর শিউরে ওঠে। বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীরা এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রায়শই। এর দু’একটি ঘটনা হয়তো বেরিয়ে আসে, বেশিরভাগ ঘটনাই অজানা থেকে যায়। আর এসবের দৃষ্টান্তমূলক বিচারও তেমন একটা হয় না। ফলশ্রুতিতে ঘটনা ঘটেই চলেছে। সামাজিক সচেতনতাও তেমন একটা নেই। এসবের জন্য সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আইনের যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থা, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, বিভাগের তৎপরতা জরুরি। সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত অপরিহার্য। যা এই অবক্ষয় থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হবে।









