- পুঁজিবাজারের রেগুলেটররা নীরব
পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক লেনদেন মন্দা। ক্রমান্বয়ে সূচক ও অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দরে পতন। কেন কমছে, নেই তার কারণ। সবমিলিয়ে পুঁজিবাজারের চলছে পুঁজি হারানোর অস্থিরতা। এ বিষয়টি পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের রেগুলেটররা নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের নীরবতায় বিনিয়োগকারীরা অনেকটা থমকে গেছেন। তাদের চোখ-মুখে এখন পুঁজি হারানোর শঙ্কা।
তবে অতি চাপে পড়ে রেগুলেটররা বলছে, যুদ্ধের (ইউক্রেন-রাশিয়া) প্রভাব সরাসরি না পড়লে, এর ক্ষতির রেশ অন্যভাবে পুঁজিবাজারে পড়েছে। যা আমরা বুঝতে পারছি, বলতে পারছি না। এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে লেনদেনসহ সূচক বেশি বেড়ে যায়। ফলে পুঁজিবাজারে শেয়ারগুলোর দর বেড়েছে অতিরিক্ত। এ কারণে বর্তমান পুঁজিবাজারে পতন কিছুটা কারেকশন হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে। কারেকশনের পর সামনে ঠিক হয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ তাদের।
চোখের সামনে পুঁজি হারাচ্ছি, বলতে পারছি না কিছুই- এমন কষ্ট কথা শেয়ার করে আইডিএলসি সিকিউরিটিজ হাউজের বিনিয়োগকারী আব্দুল হাকিম বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মৌলভিত্তিক বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের চার লাখ টাকার শেয়ার কিনেছি। মন্দার কারণে এখন সেখানে ৩৩ শতাংশ লোকসান গুনছি। এর সঙ্গে আগের বিনিয়োগের লোকসান যোগ হবে। পুঁজিবাজারের যে অবস্থা সামনে আরো কমবে। এরপরও ভাবি স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে পুঁজিবাজার। কিন্তু না।
দুই দশক ধরে পুঁজিবাজারের লেনদেন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ২০১০ সালে ধস দেখেছি। এরপর ছোট ছোট অনেক পতন দেখেছি। এসব দেখে বুঝেছি, পুঁজিবাজার পতন কেন হয়। আসলে আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের পতন হতে কারণ লাগে না। তেমনি উত্থানে কারণ লাগে না। অনেকটা ভৌতিকভাবে পুঁজিবাজার উত্থান পতন হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই।
একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বলেন, রেগুলেটরদের সব প্রত্যাশা ধুলোয় মিশিয়ে উল্টো গতিতে পুঁজিবাজার। তাদের নেওয়া পুঁজিবাজারের বিভিন্ন উন্নয়ন গতি যেন জলেই ভেসে যাচ্ছে। ধারাবাহিক মন্দায় মুখ থুবড়ে পড়েছে পুঁজিবাজার। পুঁজি হারানোর বৃত্ত বড় হয়ে দিশেহারায় নিরীহ বিনিয়োগকারীরা। ফলে পুঁজিবাজার প্রতি অনাস্থা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
তারা বলেন, চলতি বছরের শুরু ইতিবাচক গতিতে পুঁজিবাজার এগিয়েছে। শুরুর প্রায় চার সপ্তাহ উত্থানে সবাইকে পুঁজিবাজারে প্রতি বিনিয়োগ আগ্রহী করে তুলেছিল। সেই সময়ে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করে। আবার অনেকে বিনিয়োগ করবে এমন আশাও দেখায়। কিন্তু ধারাবাহিক মন্দায় তাদের সেই নতুন বিনিয়োগ এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশিরাও নিরাশায় রূপে ফিরেছে। সবমিলিয়ে ক্ষতির মুখেই পুঁজিবাজার।
যদিও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তাদের বিগত উন্নয়নকে পুঁজি করে আশা করেছিল রোজার মাসে লেনদেনে দেড়-দুই হাজার কোটি টাকায় যাবে। তাদের সেই আশা উল্টো গতিতে চলছে। লেনদেন বৃদ্ধির পরিবর্তে বিনিয়োগ অনাস্থায় বর্তমানে ৪শ কোটির ঘরে চলে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন সামান্য বাড়লেও মন্দার কবলে রয়েছে জানিয়ে বিনিয়োগকারীরা বলেন, মন্দার কারণে হাজার কোটি টাকার লেনদেন বর্তমানে চার-পাঁচশ কোটি টাকার। মন্দায় কারণে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দরে পতন হয়েছে। কমেছে সব ধরনের সূচক।
হঠাৎ করেই চলতি বছরের গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকার নিচে চলে এসেছিল। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি হাজার কোটি টাকায় লেনদেন ওঠলেও তা ধরে রাখতে পারেনি। পরের কার্যদিবস থেকে ফের হাজার কোটি টাকার নিচে নেমেছিল। লেনদেন কমে ৬শ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছিল। সেখানে থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১০ মার্চ হাজার কোটি টাকা ঘরে চলে এসেছিল। এরপরের দিন লেনদেন ফের হাজার কোটি টাকার নিচে এসেছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৫ মার্চ হাজার কোটি টাকার ঘরে লেনদেন ফিরে। পরের দিনে সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ফের লেনদেন ৮শ কোটি টাকার ঘরে অবস্থান ছিল।
এরপর দুই কার্যদিবস লেনদেন ৯শ কোটি টাকার ঘরে এসেছিল। সেই লেনদেন বুধবার ৮শ কোটি টাকার ঘরে অবস্থান চলে এসেছিল। সেখান থেকে গত বৃহস্পতিবার লেনদেন এগারশ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছিল। গত রবিবার কমে লেনদেন ৮শ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছিল। গত সোমবার কমে লেনদেন ৬শ কোটি টাকা, মঙ্গলবার ৫শ কোটি টাকা এবং বুধবার ৪শ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছিল। সেখান থেকে লেনদেন বৃহস্পতিবার ৫শ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছে। লেনদেন এধরনের কমাকে স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর উত্থান হয়। আর ৬০ দশমিক ৩৭ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর পতন হয়। এদিন ডিএসইতে অধিকাংশ খাতের কোম্পিানির শেয়ার দর পতন হয়েছে। এ ধরনের কমাকে স্বাভাবিক নেয়নি বিনিয়োগকারীরা বলে জানায় পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসইতে বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছে ৫১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আগের দিন বুধাবার লেনদেন হয়েছিল ৪৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এদিন লেনদেন হওয়া ৩৮১টি কোম্পানির মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে ৯৯টির, কমেছে ২৩০টির এবং পরিবর্তন হয়নি ৫২টির। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২১ দশমিক ২৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৪১ দশমিক ২৩ পয়েন্টে। এছাড়া ডিএসই-৩০ সূচক ৭ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট এবং ডিএসইএস সূচক ২ দশমিক ৬১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ হাজার ৪৫১ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ৪৫৩ দশমিক ৬০ পয়েন্টে।
লেনদেন মন্দাতেও এদিন ডিএসইতে বেক্সিমকোর শেয়ার কেনাবেচায় কদর সবচেয়ে বেশি ছিল। ফলে লেনদেন শীর্ষে ডিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ার স্থান পেয়েছে। এদিন ডিএসইতে বেক্সিমকো ৪২ কোটি ৮৫ হাজার টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।
ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ অবস্থানে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে সোনালী পেপার ২৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, লার্ফাজ-হোর্ডসিম ২৫ কোটি ৪ লাখ টাকা, জিবিবি পাওয়ার ১৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস ১১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, আইপিডিসি ১০ কোটি ৩ লাখ টাকা, নাহি এ্যালুমিনিয়াম ৯ কোটি ৩ লাখ টাকা, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, স্কয়ার ফার্মা ৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ইয়াকিন পলিমার ৭ কোটি ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।









