গোটা ইউরোপে গ্রীষ্মকাল থেকে বিদ্যুতের দাম কিছুটা কমেছে। আর ভালো আবহাওয়ার কারণে গ্যাসের মজুতও প্রায় পূর্ণ। অথচ এই গ্যাসের দামই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছিল ছয় গুণ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপ থেকে সুসংবাদ আসছে। বলা যায় সুসংবাদের ভিড়ে বেড়েছে। তবে এমন সুসংবাদে তলিয়ে গিয়ে বোকা বনে যাওয়া একেবারেই ঠিক হবে না। কারণে সামনের দিনগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে যাচ্ছে গোটা ইউরোপ। আর সেই সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানির চাহিদা আর ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতি। দ্য ইকোনোমিস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমনটাই ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইউরোপ ভিত্তিক জ্বালানি আর ভূ-রাজনীতি নিয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে যেভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা হয়েছে সে দিকটা চমৎকার। ধরুন, আপনি যদি সারাবিশ্বের ইউরোপের বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেন তাদের পুরোনো মহাদেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে। কিংবা ইউরোপ নিয়ে তারা কী ভাবছে, তাহলে প্রায়শই দুই ধরনের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে তারা। যার মধ্যে একটি নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয়।। চলমান কঠিন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে সহায়তা করার যেমন ইচ্ছে, তেমনি বিপরীতে রুশ আগ্রাসনকে প্রতিহত করার সংগ্রামের পক্ষে সমর্থন। তারা মূলত, ইউরোপের একতা, দৃঢ়তা ও অমূল্য নীতিগত দিকেই দৃষ্টি ফেলছে।
নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের জাতীয়তাবোধ বিষয়ক ব্যাপার। তবে দ্বিতীয়টি হলো বিপদসংকেত। আসছে ২০২৩ সালের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মহামন্দার সঙ্গে যুদ্ধে ইউরোপের সক্ষমতার পরীক্ষা যাবে। আর এই সক্ষমতার যে আত্মবিশ্বাস সেখানে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার পুনর্গঠন, আমেরিকার পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ফাটল যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয় এমন দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলছে। এটি কেবল মহাদেশের সমৃদ্ধির ঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ট্রান্সআটলান্টিক জোটের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের জন্যও সুখকর নয়।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে। যেমন বলা যেতে পারে রাশিয়া গত ২২ নভেম্বর ইউরোপে শেষ অপারেশনাল পাইপলাইনটি বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ইউক্রেনজুড়ে জরুরি বিদ্যুৎব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইউরোপের গ্যাস মজুত পুনরায় পূর্ণ করতে হবে ২০২৩ সালে। শুধু তাই নয় পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়ার সরবরাহ গ্যাস ছাড়াই। বর্তমানের সুসংবাদগুলো আপাতভাবে ভালো বোধ তৈরি করলেও অস্বস্তিটা ভেতরে ভেতরে বেড়েই চলেছে।
বলে রাখা ভালো, ইউরোপের সংকট শুধু কোনো এলাকাভিত্তিক নয়। এটা গোটা বিশ্বব্যবস্থার জন্যই চাপ সৃষ্টি করবে। এমনকি দূর প্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিকাঠামোর ওপরও দূরবর্তী প্রভাব ফেলতে পারে। যা সেসব দেশের জ্বালানি ক্ষমতাকে বিপদে ফেলতে পারে। পাশাপাশি ভূরাজনীতিগত বিপদও ডেকে আনতে পারে। বলতে কি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখা বাংলাদেশও প্রভাব বলয়ে রয়েছে। যে কারণে ইউরোপের আগামীর পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের সরকারপ্রধান যুদ্ধ বন্ধের জন্য বার বারই আহ্বান জানিয়েছেন।
ফেরা যাক দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদনে। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য ভ্লাদিমির পুতিন ‘জ্বালানি অস্ত্র’ ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। আবহাওয়া, জ্বালানি ও মৃত্যুহারের মধ্যে যদি সুষম সম্পর্ক বজায় না থাকে তাহলে পুতিনের ‘জ্বালানি অস্ত্র’ বা ‘জেনারেল উইন্টার’ ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করবে। যুদ্ধে যে পরিমাণ ইউক্রেনীয় মারা গেছেন, তার চেয়ে বেশি ইউরোপিয়ান মারা যেতে পারেন। যেখানে জ্বালানির প্রকৃত দামের ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সঙ্গে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু সম্পর্কিত।
এসব কারণে চলতি বছরের জ্বালানি সংকট ইউরোপজুড়ে ১ লাখ বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। আর যদি তাই হয়, তাহলে পুতিনের ‘জ্বালানি অস্ত্র’ ইউক্রেনের বাইরে তার আর্টিলারি, ক্ষেপণাস্ত্র ও সরাসরি ড্রোন হামলায় যত মানুষ মারা যায় তার চেয়ে বেশি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এটি আরও একটি বড় কারণ হলো, রাশিয়ার বিরুদ্ধে শুধু ইউক্রেনের প্রতিরোধ নয়, এটি ইউরোপেরও লড়াই।
দ্য ইকোনোমিস্টের মতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ তীব্র অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। জ্বালানি মূল্যস্ফীতি ইউরোপের বাকি অর্থনীতির খাতেও সংকট তৈরি করেছে। ফলে চরম দ্বিধান্বিত ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানো প্রয়োজন। যদি সুদের হার খুব বেশি হয় তবে এটি ইউরো জোনের সদস্যদের অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, যুদ্ধ ইউরোপের ব্যবসায়িক মডেলের একটি দুর্বলতাও প্রকাশ করছে। ইউরোপের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে জার্মানির, রাশিয়া থেকে সরবরাহ করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প বাজার হিসেবে আরেক ‘স্বৈরাচারী’ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যদিও স্পষ্ট হয়েছে রাশিয়া-চীনের সম্পর্ক, ব্যয় বৃদ্ধি ও পশ্চিমা-চীনের বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো।
আমেরিকার অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের কারণে আতঙ্ক আরও বেড়েছে, যা ভর্তুকি ও সুরক্ষাবাদের ঘূর্ণিঝড়ে ট্রান্সআটলান্টিক জোটের দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। মেক-ইন আমেরিকার আওতায় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আইনে জ্বালানি, উৎপাদন ও পরিবহন বাবদ ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এই স্কিমটি শিল্প নীতিগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ যা চীন কয়েক দশক ধরে অনুসরণ করছে। বিশ্ব অর্থনীতির যখন অন্য দুটি স্তম্ভ আরও হস্তক্ষেপ ও সুরক্ষাবাদী হয়ে উঠছে, ইউরোপ তখন মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মগুলো সমুন্নত রাখতে জোর দিচ্ছে।
এরই মধ্যে ইউরোপের কোম্পানিগুলো ভর্তুকি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। নর্থভোল্ট, একটি সুইডিশ ব্যাটারি স্টার্টআপ। আমেরিকাতে উৎপাদন প্রসারিত করতে চায় তারা। ইবারড্রোলা, একটি স্প্যানিশ জ্বালানি কোম্পানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় আমেরিকাতে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করছে। অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যয়বহুল জ্বালানি ও আমেরিকান ভর্তুকির সংমিশ্রণ ইউরোপকে ব্যাপকভাবে শিল্পহীনতার ঝুঁকিতে ফেলছে। বিএএসএফ, একটি জার্মান রাসায়নিক জায়ান্ট, সম্প্রতি তার ইউরোপীয় কার্যক্রমকে ‘স্থায়ীভাবে’ সঙ্কুচিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
বিনিয়োগ হারানো ইউরোপকে আরও দরিদ্র করে তোলে ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা হ্রাসে প্রভাব ফেলে। করোনা মহামারি পূর্বের জিডিপি পুনরুদ্ধারে ইউরোপ অন্য যে কোনো অর্থনৈতিক ব্লকের চেয়ে খারাপ করেছে। বিশ্বের ১০০টি বড় কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৪টি ইউরোপীয়। রাজনীতিবিদরা নিয়মের বাইরে গিয়ে এবং করপোরেটের ধারার একটি ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায় তাদের নিজস্ব ভর্তুকি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রলুব্ধ হচ্ছেন। জার্মানির অর্থমন্ত্রী আমেরিকার ‘বিনিয়োগ বাড়ানো’ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ‘ইউরোপীয়ান জাগরণ’ এর আহ্বান জানিয়েছেন।
এভাবে ভর্তুকির শ্রেণি আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়াচ্ছে। ইউক্রেনের জন্য আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক সহায়তা ব্যাপকভাবে ইউরোপকে ছাড়িয়ে গেছে। চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ায়, আমেরিকা নিরাপত্তার জন্য অর্থ প্রদানে ইউরোপের ব্যর্থতাকে দায়ী করছে। ন্যাটোর বেশিরভাগ সদস্য প্রতিরক্ষাখাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল অনেকটাই ‘নির্বোধ’। যদিও যুদ্ধের কারণে আমেরিকা ও ইউরোপ ট্রাম্পের সময়ের চেয়ে আরও বেশি একত্র হয়েছে। তবে বিপদ হলো একটি দীর্ঘ সংঘাত ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে তাদের আবার আলাদা করে দিতে পারে। এতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং খুশি হবেন বৈকি।
বিপজ্জনক ফাটল এড়াতে, আমেরিকাকে অবশ্যই বড় পরিসরে ভাবতে হবে। বাইডেনের সুরক্ষাবাদ ইউরোপের জীবনীশক্তি হারানোর হুমকিস্বরূপ। বাইডোনোমিক্সের প্রধান লক্ষ্য হলো চীনের প্রধান শিল্পের আধিপত্য বন্ধ করা। তবে আমেরিকার ইউরোপীয় বিনিয়োগে কৌশলগত আগ্রহ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি ভর্তুকির জন্য উপযুক্ত করে তুলতে হবে এবং ট্রান্সআটলান্টিক জ্বালানির বাজারগুলোকে আরও গভীরভাবে সংহত করতে হবে।
ইউরোপকে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হবে। জার্মানির মতো ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের জ্বালানির চাহিদায় ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করে মূল্য ও চাহিদায় সামঞ্জস্য আনতে হবে। একটি নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে অর্থাৎ প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয় করতে হবে।
প্রশংসা ও শঙ্কার কথা উঠলেও, ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ক এখন হতাশাব্যঞ্জক। তবে ইউরোপকে যুদ্ধের মাধ্যমে বিভক্ত করা উচিত নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক জোটের মানিয়ে নেওয়া ও টিকে থাকা অত্যাবশ্যক।
আনন্দবাজার/শহক









