
বিশ্ব মেডিটেশন দিবস আজ-
আপনি কি খুব বেশি আবেগকাতর, নেতিবাচক আবেগগুলো কি খুব বেশি ভোগায় আপনাকে? বৈচিত্র্যময় মানব-মনের এমনি নানা অনুভূতির সাথে মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন নিউরোসায়েন্টিস্টরা। তারা জানাচ্ছেন, এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারেন আপনি নিজেই।
মানুষ যত, বিচিত্র তত আবেগ
প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষ হিসেবে আমরা কিছু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, সাধারণভাবে যা ব্যক্তি ও পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রকম। যেমন, চাকরি হারানো বা বিয়ে-বিচ্ছেদের মতো ঘটনায় একজন হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করে, কিন্তু একই ধরনের ঘটনায় আরেকজন বছরের পর বছর আত্মধিক্কার আর হতাশায় কর্মবিমুখ দিন কাটায়।
কেন এমনটা হয়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, একেকজন মানুষের আবেগীয় চরিত্র ও আবেগের ধরন একেকরকম, তাই একই ঘটনায় একেকজন মানুষের প্রতিক্রিয়াও হয় ভিন্ন। প্রত্যেকের চেহারা ও আঙুলের ছাপ যেমন আলাদা, মানুষ ভেদে আবেগের প্রতিক্রিয়াও তেমনি ভিন্ন। শুনে মনে হতে পারে, এ আর এমন কী? এ তো নতুন কিছু নয়।
চিন্তা ও আবেগ: দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা?
নিউরো-ইমেজিং গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের আবেগের প্রকাশ ও ধরনের সঙ্গে তার মস্তিষ্কের কাঠামো ও কর্মপ্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞান এতকাল মনে করতো, মানুষের চিন্তা ও আবেগ- এ দুটো ভিন্ন মেরুর ব্যাপার, যার একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো সম্পর্ক নেই এবং চিন্তা হলো একটা উচ্চস্তরের ব্যাপার আর আবেগ হলো নিম্নস্তরের ও পাশবিক কিছু একটা।
নিউরোসায়েন্স বলে, মানুষের চিন্তা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের ভিন্ন দুটো অংশ। চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের সামনের দিকে অবস্থিত ফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকে, যা চিন্তাশক্তির পাশাপাশি মনোযোগ, কার্যকারণ ও বিচারবুদ্ধির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। উল্লেখ্য, অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানব-মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স বেশ আলাদা এবং উন্নততর।
আর আবেগের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কে তুলনামূলক ভেতরের দিকে অবস্থিত লিম্বিক সিস্টেম (এমিগডালা ও হিপোক্যাম্পাস নিয়ে গঠিত), যা মানুষের রাগ ক্ষোভ দুঃখ দুশ্চিরুা ভয়ের অনুভূতির সাথেও সম্পর্কযুক্ত। মজার ব্যাপার হলো, কাঠামোগত দিক থেকে মানুষের লিম্বিক সিস্টেম অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় খুব বেশি আলাদা নয়।
আবেগের ধরন বদলে দিতে পারেন আপনি নিজেই এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের ভূমিকাই আসল, ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কোনো ভূমিকা এখানে নেই এবং কাজের দিক থেকেও মস্তিষ্কের এ দুই অংশ পরস্পর সম্পর্কহীন।
কিন্তু নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিউরোসায়েন্টিস্টদের সাম্প্রতিক অভিমত হলো, আবেগ নিয়ন্ত্রণের বেলায় বেশ ভালোভাবেই আছে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভূমিকা। শুধু তা-ই নয়, একাধিক গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, আবেগের ধরন আপনার যা-ই হোক না কেন, একে আপনি পাল্টাতে পারেন। চাই শুধু কিছু অনুশীলন। এ ধারণাকে একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
নিউরোনে নিউরোনে সহযোগ
আবেগের বিভিন্ন ধরন ও প্রতিক্রিয়ার সাথে মানব-মস্তিষ্কের কোন অংশের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে অসংখ্য গবেষণা করেছেন নিউরোসায়েন্টিস্টরা। তারই একটিতে একদল স্বেচ্ছাসেবককে বিভিন্ন ধরনের কিছু স্নায়ু-উদ্দীপক আর বিষাদপূর্ণ ছবি ও ভিডিও দেখানো হয়। এরপর তাদের আবেগীয় প্রতিক্রিয়াগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
অবাক হয়ে গবেষকরা লক্ষ করলেন, দুঃখপূর্ণ ও নেতিবাচক আবেগ থেকে একজন মানুষ কত দ্রুত পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে তার সঙ্গে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি মূলত নির্ভর করে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা এবং প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স ও লিম্বিক সিস্টেমের মধ্যবর্তী নিউরোনগুলোর সুদৃঢ় যোগাযোগ অর্থাৎ সংযোগায়নের ওপর।
গবেষকদের মতে, যত মজবুত হবে এ সংযোগায়ন, আবেগের যেকোনো অবস্থা থেকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও তত বেশি। কারণ, আমাদের চিন্তা নিয়ন্ত্রণকারী অংশ প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স প্রভাবিত করে আমাদের আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশ লিম্বিক সিস্টেমের এমিগডালা-কে। আর এ দুয়ের মধ্যবর্তী নিউরোনগুলোর মধ্য দিয়ে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকে এমিগডালা-তে এমন কিছু বার্তা পৌঁছায়, যা লিম্বিক সিস্টেমের উদ্দীপনাকে স্তিমিত করে এবং যেকোনো নেতিবাচক আবেগ থেকে আমরা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারি। আর এজন্যে চাই এ দুয়ের মধ্যবর্তী নিউরোনগুলোর পারস্পরিক সুদৃঢ় সংযোগায়ন।
নিউরোপ্লাস্টিসিটি: নিউরোসায়েন্সের নতুন সম্ভাবনা
এখন প্রশ্ন হলো, নির্দিষ্ট একটি বয়স পেরিয়ে গেলে মস্তিষ্কে নতুন নতুন সংযোগ-সম্ভাবনা বা সংযোগায়ন বাড়ানোর কোনো উপায় আছে কিনা। বিজ্ঞানীরা শোনাচ্ছেন আশার কথা। তারা বলছেন, উপায় আছে বৈ কি। তা হলো, মস্তিষ্কের নিউরোনগুলোর একটি অনন্য ও চমৎকার গুণ আছে, যার নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা পেলে জীবনের যে-কোনো সময়েই মস্তিষ্ক নিজের গঠন ও কর্মপ্রক্রিয়া বদলে নিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কে এ উদ্দীপনা যোগানোর অন্যতম উপায় হলো মেডিটেশন বা নিমগ্ন কল্পনা ও মনোযোগ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাগ্র মনোযোগে খুব ভালো ভায়োলিন বাজায়, তাদের মস্তিষ্কের যে অংশটি তা নিয়ন্ত্রণ করে সেই অংশের আকার বেড়ে গেছে এবং সেইসাথে এর কার্যকারিতায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
শুধুমাত্র চিন্তাই বদলে দিতে পারে বাস্তবতা
শুধু এমন বাহ্যিক উদ্দীপনাতেই নয়; বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের চিরুা কল্পনা ইচ্ছাও মস্তিষ্কে কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। চিন্তা ও কল্পনা কীভাবে নিউরোনের মৌলিক গঠন ও কর্মকাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে তা বোঝা যায় চমৎকার একটি গবেষণায়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী আলভারো পাসকুয়েল লিয়ন। তিনি একটি ভিন্নধর্মী গবেষণা-কার্যক্রম পরিচালনা করেন, যেখানে একদল স্বেচ্ছাসেবক নিয়মিত গভীর মনোযোগে কল্পনা করতেন যে, ডান হাতের পাঁচটি আঙুল দিয়ে তারা কি-বোর্ড বাজাচ্ছেন। ক্রমাগত এক সপ্তাহ চলল এ কাল্পনিক কি-বোর্ড বাদন। এক সপ্তাহ পর দেখা গেল অদ্ভুত ব্যাপার। নিউরো-ইমেজিং পরীক্ষায় প্রমাণিত হলো, মস্তিষ্কের যে অংশটি ডান হাতের আঙুলের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশটির প্রসারণ ঘটেছে। অর্থাৎ চিন্তা, শুধুমাত্র চিন্তাই মস্তিষ্কে এমন গঠনগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
নিউরোসায়েন্টিস্টরা এখনো বলতে পারছেন না যে, মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা গঠনগত পরিবর্তনের এই সম্ভাবনা কী পরিমাণ। কিন্তু তারা এটা বলছেন- মেডিটেশন, চিন্তাশক্তির অনুশীলন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পর্যাপ্ত মনোযোগ ও আনন্দ-অনুরণন চর্চার মাধ্যমে বেশ ভালোভাবেই সম্ভব আমাদের আবেগের ধরনকে কাঙ্ক্ষিত উপায়ে পরিবর্তন করা। অযাচিত বিষাদ বিষণ্নতা হতাশা দুঃখ-বিলাসিতার মতো নেতিবাচকতার বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায়ও এটাই বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। (তথ্যসূত্র: নিউজউইক-২৭ ফেব্রুয়ারি ও ৫ মার্চ, ২০১২)
লেখক: ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
আনন্দবাজার/শহক








