রাজশাহীর বাঘা, চারঘাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছে। আখ ও খেজুরের ভেজাল এসব গুড় তৈরি করে বিক্রয় হচ্ছে স্থানীয় বাজারসহ ও দেশের বিভিন্ন হাটবাজারগুলোতে। গত সোমবার বাঘা উপজেলায় গুড় তৈরি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৫০ মণ ভেজাল খেজুরের গুড়, গুড় তৈরির বিভিন্ন উপকরণ সামগ্রী জব্দ করা হয়। ওই সময় কারখানার মালিকসহ ০৭ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাধারনত শীতকালে আখ ও খেজুরের গুড় উৎপাদন হয়। শীতকালে কৃষকরা কৃষি কাজের পাশাপাশি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুর গুড় উৎপাদন করে। উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য নিয়ন্ত্রন কর্মকর্তার নিরাবতার সুযোগ নিয়ে সরকারি নিষিদ্ধ আখ মাড়াই কল ও কেমিকেলযুক্ত উপাদান দিয়ে গুড় তৈরি করছে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার এক শ্রেণি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।
আখের গুড় তৈরিতে ব্যবহার করছে সুগারমিলের পরিত্যক্ত গো খাদ্য চিটাগুড়, চিনি, হাজার পাওয়ারের রং ও আটা। খেজুর গুড় তৈরিতে গাছিরা ব্যবহার করছে রসের পাশাপাশি চিনি, রং এবং আটা। সাধারনত অধিক লাভ ও ওজন বৃদ্ধির জন্য গুড় উৎপাদনকারীরা এ সকল ক্ষতিকর গো-খাদ্যসহ বিভিন্ন কেমিকেলগুলো ব্যবহার করছে।
এ প্রসঙ্গে চারঘাট উপজেলা মেডিকেল অফিসার আতিকুল হক রতন বলেন, ক্ষতিকর গো-খাদ্য ও কেমিকেল ব্যবহারে উৎপাদিত গুড় খেলে মানব শরীরে পেটের বিভিন্ন রোগ ছাড়াও ক্যানসারের মতো ভয়ানক রোগ হওয়ার সম্ভাবন রয়েছে।
চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষীপুরের ইউনিয়নের বুদিরহাট গ্রাম, ডাকরা ও বাকরা, চারঘাট ইউনিয়নের পরানপুর, গওরা, কাকঁড়ামারী, মেরামতপুর দিড়িপাড়া, নিমপাড়া ইউনিয়নের নন্দনগাছি, কালুহাটি, শলুয়ার জাগিরপাড়া, হলিদাগাছি, মাড়িয়া, বামদিঘী, ইউসুফপুরের বাদুড়িয়া, টাঙ্গন, সরদহ ইউনিয়নের ঝিকরা, খোর্দ্দগবিন্দপুর, চারঘাট পৌরসভার মোক্তারপুর, পিরোজপুর ডালিপাড়া, মিয়াপুরে আখ ও খেজুরের গুড় তৈরি হয়।
এ সকল এলাকায় সরকারিভাবে নিষিদ্ধ আখ মাড়াই কল দিয়ে আখের রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের জন্য সামান্য পরিমান আখের রসের মধ্যে গো-খাদ্যে ব্যবহৃত চিটাগুড়, হাইড্রোজ, রং ও চিনি ব্যবহার করে তৈরি করছেন ভেজাল আখের গুড়। এছাড়াও খেজুর গুড় তৈরিতে ব্যবহার করছেন চিনি, আটা, হাইড্রোজ ও কেমিক্যাল রং।
এলাকাবাসীরা জানান এ সকল ভেজাল আখ ও খেজুর গুড় স্থানীয় বাজারসহ দেশের বিভিন্ন হাট বাজারগুলোতে বাজারজাত করছেন।
চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য স্যানিটারি পরিদর্শক আফজাল হোসেন বলেন প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা লোকমান হোসেন কে সঙ্গে নিয়ে মেরামতপুর ও মিয়াপুরের কয়েকটি গুড়ে কারখান পরিদর্শন করেন। প্রাপ্ত স্যাম্পল পরিক্ষা শেষে মাত্রাতিরিক্ত কেমিকেল পাওয়া গেছে। তবে খুব দ্রুত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা সামিরার নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায় নি, তবে অভিযোগ পেলে দ্রুত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫০ মন ভেজাল খেজুরের গুড় জব্দ করা হয়েছে। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে। রোববার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বাঘা উপজেলার আড়ানী চকরপাড়া গ্রামের গোয়েন্দা পুলিশ এ অভিযান চালায়। সেখান থেকে ভেজাল গুড় তৈরীর বিভিন্ন উপকরণ সমগ্রী জব্দ করা হয়। সোমবার দুপুরে রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে এ সব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন জানান, ডিএসবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি টিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভেজাল খেজুরের গুড় তৈরির কারখানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে ৫০ মণ ভেজাল খেজুরের গুড়, ভেজাল গুড় তৈরির বিভিন্ন উপকরণ সামগ্রী জব্দ করা ছাড়াও সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরা হলেন, কারখানার মালিক রকিব আলী, সহযোগি সুমন আলী, অনিক আলী পাইলট, মাসুদ রানা, বিপ্লব হোসেন সাজু, মামুন আলী ও বাবু।
পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ২/৩ মাস যাবৎ তারা এই কারখানায় চিনি, চুন, হাইড্রোজ, ফিটকেরি, ডালডা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মিশিয়ে ভেজাল খেজুরের গুড় তৈরি করে আসছে। তারা এগুলো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করে থাকে। গুড় তৈরির ক্ষেত্রে তারা যে সকল রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে সেগুলো মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও জটিল রোগের সৃষ্টি করে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বাঘা থানায় মামলা করা হয়েছে।









