একসময় লক্ষীপুরের গ্রামাঞ্চলে হোগলা পাতা নির্ভর কুটির শিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এ শিল্প বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত। প্রকৃতির আর্শীবাদে নদ-নদী, খাল-বিল ও ঝিলের কিনারায় জন্মানো এ জলজ উদ্ভিদ 'হোগলা পাতা' দিয়ে তৈরী করা হতো সংসার ও সমাজ জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী। সংগৃহিত পাতা দিয়ে তৈরী সামগ্রী বিক্রি করে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতো। বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রীর আধিক্যে হারিয়েই যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য হোগলা পাতা।
তবে লক্ষীপুরের গ্রাম এলাকার হাটগুলোতে এখনো এ পাতার চাহিদা রয়েছে উল্লেখযোগ্য। জেলার রায়পুর উপজেলার চরপাতা, চরবংশী, সদর উপজেলার পশ্চিম চর রমনীমোহন ও মধ্যম চর রমনীমোহন এবং রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা উপকূলীয় এলাকায় হোগলা পাতা বেশী উৎপাদিত হয়।
স্থানীয়রা জানান, উপকূলীয় এ জেলার মাটি হোগলা পাতা জন্মানোর জন্য খুবই উপযোগী। তাই আবারো উদ্যোগ নিলে এর সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতায় লক্ষীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির যোগান দিতে পারে এ হোগলা পাতা। এক সময় মক্তব, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরসহ বিভিন্ন সামাজিক আচার- অনুষ্ঠানে হোগলা পাতার তৈরি পাটির ব্যাবহার ছিল খুব বেশী। বিশেষ করে গ্রামের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবারে খাওয়া-দাওয়া, নামাজ পড়া ও ঘুমানোর কাজে এ পাটির ব্যবহার করতো। ওই সময়ের বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে তীব্র গরমে এ পাতার তৈরি হাতপাখা ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। তখন গ্রামের প্রত্যেক ঘরেই হোগলা পাতা নির্ভর শিল্পসামগ্রী দেখা যেতো। কিছু সংখ্যক মানুষ আয়ের উৎস হিসেবে হোগল পাতার কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভর করতো।
প্রাকৃতিক উপায়ে জন্মানো এ জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবনযাপন করতো এ মানুষগুলো। বাজার থেকে এ জলজ উদ্ভিদ অর্থাৎ হোগল পাতা কিনে গ্রামের কুঁড়ে ঘর ও ফসলের ক্ষেতর বেড়া, ঘরের ছাউনি-ফসল রাখার টুকরি তৈরীর কাজে ব্যবহার হত। আবার গ্রামের নারীরা বাড়তি আয়ের উৎস হিসাবে কোমল ও নরমপাতা আলাদা করে তা দিয়ে পাটি-চাটাই, হাতপাখা, নামাজের মাদুর, কুশন, ঝুড়ি, টুপি ও টুকরিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করত। এসব পণ্য শহরের অনেক মানুষকেও ব্যবহার করতে দেখা যেত। জানা যায়, হোগল পাতা নামক এ জলজ উদ্ভিদ বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের এটেঁল মাটিতে জন্মে।
নদীর, খাল ও ঝিলের কূলে হালকা জলাবদ্ধস্থানে বেশি জন্মাতে দেখা যায়। লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ১২ ফুট হয়। যখন ১ থেকে ২ ইঞ্চি সারি সারি পাতার সমন্বয়ে বেড়ে ওঠে তখন সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর সবুজ পরিবেশ। বেড়ে ওঠার কিছুদিন পর এ জলজ উদ্ভিদে ফুলের জন্ম হয়। আর এ ফুল থেকে তৈরি হয় এক প্রকার পাউডার যা পুষ্টিকর। এটি সুস্বাদু খাবারের উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কৃষকরা জানান, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে জন্মে থাকে এ উদ্ভিদ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজে এ পাতা ব্যবহার ছাড়াও এর ফুল থেকে পাউডার সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করা যায়। হোগলা ফুল থেকে সংগৃহিত গুঁড়া বা পাউডারের প্রতিকেজির মূল্য প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা। এটি দিয়ে পিঠা-পায়েসসহ নানা মূখরোচক খাবার তৈরী হয়। এখানে হোগল ফুলের গুঁড়া দিয়ে তৈরি এক ধরনের কেক বেশ জনপ্রিয়।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতনরা জানান, বর্তমানে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক পণ্য বাজারে সয়লাব হওয়ায় হোগলা পাতা নির্ভর হস্তশিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে চলেছে। তাদের ধারণা, সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে সারাদেশে হোগলা পাতা ও এর গুঁড়া বাজারজাত করা সম্ভব। তাছাড়া হোগলা পাতা নির্ভর কুটিরশিল্প পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বৈদেশিক আয় আরও বেশী অর্জন করা যাবে।
জেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা এ টি এম খোরশেদ আলম জানান, হোগলা পাতার ফুল থেকে যে পাউডারগুলো হয় সেটিই হোগলের গুঁড়ি। এটি চকচকে হলুদ রঙের হয়। এ গুঁড়ো খুব পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাবার।
তিনিও জানান, সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হলে সারাদেশসহ বিদেশে হোগলা পাতার সামগ্রী ও এর গুঁড়া বাজারজাত করা সম্ভব।









