টিবির চিকিৎসায় সফলতা
যক্ষ্মা রোগিদের জন্য সরকার দেশেই ওষুধ তৈরি করছে। বিদেশেও রপ্তানি করা হবে: জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী
যক্ষ্মা (টিউবারকিউলোসিস্ বা টিবি) একটি সংক্রামক রোগ। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামের জীবাণুর কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। ‘যক্ষ্মা’ শব্দটা এসেছে ‘রাজক্ষয়’ থেকে। ক্ষয় বলার কারণ, এতে রোগীরা খুব শীর্ণ (রোগা) হয়ে পড়েন। যক্ষ্মা প্রায় যেকোনও অঙ্গে হতে পারে। ব্যতিক্রম কেবল হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয়, ঐচ্ছিক পেশী ও থাইরয়েড গ্রন্থি। যক্ষ্মা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফুসফুসে। তবে গরুর দুধ পাস্তুরায়ণ প্রচলনের আগে অন্ত্রেও অনেক বেশি হত।
বাতাসের মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু ছড়ায়। যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে রোগের জীবাণু বাতাসে গিয়ে মিশে রোগের সংক্রমণ ঘটায়। টিকা বা ভ্যাকসিনেশনের মধ্যে দিয়ে যক্ষ্মা প্রতিরোধ করা যায়। ফুসফুসে যক্ষ্মা হলে হাল্কা জ্বর ও কাশি হতে পারে। কাশির সঙ্গে গলার ভেতর থেকে থুতুতে রক্তও বেরোতে পারে। মুখ না ঢেকে কাশলে যক্ষ্মা সংক্রমণিত থুতুর ফোঁটা বাতাসে ছড়ায়।
আলো-বাতাসহীন অস্বাস্থ্যকর বদ্ধ পরিবেশে মাইকোব্যাক্টেরিয়াম অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হিসেবে ৫-৬ মাস জ্বর থাকার মূল কারণ এই টিবি। এছাড়াও সাধারণত তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, কাশির সাথে কফ এবং মাঝে মাঝে রক্ত বের হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা এবং ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি ফুসফুসের যক্ষ্মার প্রধান উপসর্গ।
যক্ষ্মা ফুসফুস থেকে অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। তখন একে ‘অ-শ্বাসতন্ত্রীয় যক্ষ্মা’ বলা হয়। যেমন প্লুরাতে প্লুরিসি, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে মেনিনজাইটিস, লসিকাতন্ত্রে স্ক্রফুলা, প্রজনন তন্ত্রে প্রজনন তন্ত্রীয় যক্ষ্মা, পরিপাক তন্ত্রে পরিপাক তন্ত্রীয় যক্ষ্মা এবং অস্থিকলায় পটস ডিজিস।
বিশেষ ধরনের ছড়িয়ে যাওয়া যক্ষ্মা হলো মিলিয়ারী যক্ষ্মা। অনেক ক্ষেত্রে ফুসফুসীয় এবং অ-ফুসফুসীয় যক্ষ্মা একসাথে বিদ্যমান থাকতে পারে। পৃথিবীর যক্ষ্মা রোগীদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি (প্রায় অর্ধেক) ভারতীয় উপমহাদেশবাসী। জীবাণু শরীরে ঢুকলেই সবার যক্ষ্মা হয় না। যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মা বেশি হয়।
এদিকে, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বা এনটিপির হিসেবে ১৯৯৫ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ত্রিশ লাখ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়। যার মধ্যে শিশু রয়েছে প্রায় বিশ হাজার। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৯৭৮ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছেন। যার মধ্যে ১৬ জন ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মায় আক্রান্ত। আর আক্রান্তদের মধ্যে দৈনিক মারা যাচ্ছে ১২৯ জন।
তবে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় সফল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটি বিশ্বে স্বীকৃত। চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। ৯৬ ভাগ রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা যাচ্ছে। ২০১৫ সালে মৃত্যুহার ছিলো প্রতি লাখে ৬৭ জন, সেটি এখন প্রায় ঊনত্রিশে।
দেশেই টিবির ওষুধ তৈরি হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এসময় দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হবে জানান তিনি। গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে টিবি বিষয়ক নবম জেএমএম প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর বাংলাদেশে জেএমএম কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে এ কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান জনস্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে যক্ষ্মা যেহেতু একটি প্রধান সমস্যা, তাই বাংলাদেশ সরকার সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তথ্যসূত্রে বলা হয়, ২০২১ সালে নতুনভাবে ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের ৯৫ শতাংশ শনাক্তকরণ এবং তাদের চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় যক্ষ্মা সংক্রমণের হার ২২৫ জন থেকে ২০২১ সালে সংক্রমণের হার ২১৮ জনের মধ্যে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সব ধরনের যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা শনাক্তকরণ বেড়েছে। যা ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার ৮৬৬ এবং ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৫৩১ জনে।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে জিন এক্সপার্ট নামে একটি উন্নত স্বয়ংক্রিয় যক্ষ্মা শনাক্তকারী পরীক্ষা চালু করেছিল। যা এখন ৫১০টি স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে সব যক্ষ্মা অনুমানকারীর জন্য এ পরীক্ষাটি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম স্বল্পমেয়াদি ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করেছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যক্ষ্মা সম্পর্কে সচেতনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকার লক্ষ্যকে একটি বাধ্যতামূলক লক্ষণীয় রোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কাগজভিত্তিক রেকর্ডিং এবং রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক রেকর্ডিং এবং রিপোর্টিং চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, এগুলো দেশে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করবো। একই সঙ্গে দেশে ভালোমানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। টিবিতে আমাদের যে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে প্রয়োজনে তা বাড়ানো হবে।
মন্ত্রী বলেন, যক্ষ্মা পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে আছে। এখনো তার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। যক্ষ্মায় প্রতিবছর ৩ লাখের অধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। অসংখ্য মারা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুর হার কমেছে। ২০১৫ সালে যেখানে ৭০ হাজারের অধিক মৃত্যু ছিল, এখন তা ৪০ হাজারে নেমে এসেছে। আমাদের মৃত্যু বেশি, কারণ জনসংখ্যা বেশি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, টিবি পরিস্থিতির অগ্রগতি হচ্ছে। ব্যাপকভিত্তিতে টিবি স্ক্রিনিং কার্যক্রম চলছে। আমাদের সব হাসপাতালে যক্ষ্মা পরীক্ষার যন্ত্রপাতি রয়েছে। টিবির বিষয়ে দেশে বেশ কিছু স্টিগমা (অপবাদ) আছে। তবে পরিবর্তন আসছে। মানুষ এখন কুসংস্কার এড়িয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাচ্ছেন। ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন। আমরা চাই মানুষ চিকিৎসা নিতে আসুক। তাদের চিকিৎসা দেওয়ার সব ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করলেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এখনো ধারণা করা হচ্ছে যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি। এই লক্ষ্যে নবম জেএমএমে যক্ষ্মা কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন প্রস্তাবিত হয়েছে। মূল চ্যালেঞ্জগুলো খুঁজে বের করে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রোগ্রামের লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টিবি মহামারির একটি টেকসই সমাপ্তির জন্য যক্ষ্মা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে অর্জনযোগ্য সমাধানগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে ওষুধ তৈরি
ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় বাংলাদেশের উদ্ভাবিত পদ্ধতি বিশ্ব গ্রহণ করেছে। দুই বছরের পরিবর্তে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার রোগীকে ৯ মাসে সুস্থ করা সম্ভব হওয়ায় নতুন এই পদ্ধতি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের উদ্ভাবিত চিকিৎসা পদ্ধতি বেনিন, বুরকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা, আইভরি কোস্ট, কঙ্গো, গিনি, নাইজার, রুয়ান্ডা, সেনেগাল, সোয়াজিল্যান্ড ও উজবেকিস্তানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভিয়েতনাম ও মঙ্গোলিয়ায় এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে। সংস্থাটির ২০১৬ সালের ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসার নির্দেশিকায় বাংলাদেশের উদ্ভাবিত পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে এমডিআর-যক্ষ্মায় আক্রান্ত মানুষ প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার এবং ২০১৬ সালে এতে প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ এই ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ গবেষণার পর নতুন এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই পদ্ধতির সুফল পেতে শুরু করেছে বিশ্বের মানুষ।









