ডেভিড লুইস ফ্লুর কারণে অসুস্থ বোধ করার পরও তার দল নিয়ে তুষারের মাঝে ভ্রমণ করছিলেন। এটা ছিল ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাস। ১৯ বছর বয়সী লুইসসহ প্রায় ২৩০ জন সৈন্য নিউ জার্সির ফোর্ট ডিক্সে অসুস্থ বোধ করেন। লুইস এক পর্যায়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বেগের মাঝে ঠেলে দেয়।
এরপর ফোর্ট ডিক্স থেকে যে স্ট্রেইন সংগ্রহ করা হয়, সেটির সঙ্গে ১৯১৮ সালের ফ্লু মহামারীর মিল পাওয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি বড় ধরনের খবরে পরিণত হয়। ১৯৭০-এর দশকে তাই ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপকে আহ্বান জানানো হয় ফ্লুর ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য। যে কারণে সরকার দ্রুত ফোর্ট ডিক্স স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরি করে এবং আশা করে যে ৮০ শতাংশ জনগণ এটি গ্রহণ করবে।
কিন্তু যা হয়েছিল তা খুবই হতাশাজনক। দ্রুততম সময়ে প্রস্তুতকৃত ভ্যাকসিন ৫০০ জন মানুষের পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া এবং ২৫ জনের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। ফোর্ট ডিক্সে প্রাদুর্ভাব দেখা যাওয়ার শুরুতে অর্ধেকের বেশি মানুষ টিকা নেয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করে। কিন্তু পরে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার মাত্র ২২ শতাংশ নাগরিক বছর শেষে ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে।
কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর ১৪০টি ভ্যাকসিন নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কখন জানব যে কোন ভ্যাকসিনটি যথেষ্ট ভালো এবং নিরাপদ, যে কাউকে সেটা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া যায়?
যদিও সাধারণত একটি ভ্যাকসিন তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। এই মহামারীতে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কর্মযজ্ঞ যে গতিতে চলছে তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। অন্তত একটি ক্যান্ডিডেট বায়োটেক কোম্পানি মডার্না জুলাইয়ে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালও শুরু করছে। মে মাসে মার্কিন সরকার ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও পরীক্ষার জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগও করেছে।
কিছু বিজ্ঞানী প্রত্যাশিত প্রথম ভ্যাকসিনটি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এ সিদ্ধান্তেও আসতে হবে কখন একটি ভ্যাকসিন গণহারে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে।
উদাহরণস্বরূপ যদি তারা সীমিত কার্যকারিতার একটি ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং প্রচার করে তবে সেটি অন্য একটি ভালো মানের ভ্যাকসিনকে বাজারে আসার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন রোলান্ড সাটার বলেন, যদি আপনি কম কার্যকারিতার একটি ভ্যাকসিনকে গ্রহণ করেন, তখন আপনি সম্ভবত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি ভ্যাকসিনের বিকাশের পথকে রুদ্ধ করতে পারেন। কভিড-১৯-এর একটি ভ্যাকসিনকে যথেষ্ট ভালো বিবেচনা করে গণহারে ব্যবহার করাই সামনের দিনগুলোতে বৈজ্ঞানিক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সেগুলো সুরক্ষিত কিনা সেটা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
লক্ষ্য নির্ধারণ করা
ভ্যাকসিনের বিকাশ মঞ্চে আসে প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল দ্বারা। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো সাধারণত অল্পকিছু মানুষের মাঝে করা হয় ভ্যাকসিনটি প্রাথমিকভাবে নিরাপদ কিনা তা নির্ণয় করার জন্য।
দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তৃত ট্রায়াল ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার আভাস দেয়। এটি প্রায়ই নির্ধারণ করে মানুষের রক্তে অ্যান্টিবডি কিংবা অন্যান্য ইমিউনিটি সেন্টিনেলস উপস্থিত আছে কিনা তা, যা কিনা রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে চালিত হয়।
তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল হাজার হাজার অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করে চেষ্টা করে আরো ভালোভাবে এটা নির্ধারণ করতে যে ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরভাবে মানুষকে রক্ষা করতে পারছে এবং সাধারণত যারা ইমিউনাইজেশনের প্রক্রিয়াধীন আছে তারা কতটা নিরাপদে আছে, যারা প্ল্যাসেবো গ্রহণ করে তাদের তুলনায়।
তবে ভ্যাকসিন বিজ্ঞানীদের মতে, আসল পরীক্ষা তখন সামনে আসবে যখন বিস্তৃতভাবে প্রতিরোধমূলকক ওষুধ দেয়া হবে। একটি ভ্যাকসিন প্রোগ্রামের প্রধান চার্লে ওয়েলার বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনো বেশ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন হচ্ছে। যারা টেস্টিং প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে তারা জানে তারা কী করছে এবং খুব অল্প ঝুঁকিই নেয়া হচ্ছে যেন ভাইরাসের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। ডাক্তাররাও তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ওয়েলার আরো বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আসলে খুব বেশি কিছু না। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যখন এটি জনগণের মাঝে বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা হয়।
এমনকি এই ট্রায়ালের মাধ্যমে তারা এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কিছু ভ্যাকসিন স্বাভাবিকভাবেই অন্যগুলোর চেয়ে অধিক কার্যকর হয়ে থাকে। এর কারণ সবসময় পরিষ্কারভাবে জানা যায় না। এটা সম্ভবত ভাইরাসের সহজাত ফ্যাক্টরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটির পরিবর্তিত হওয়ার প্রবণতা এবং শরীরে কাজ করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের ইমিউন সিস্টেমের প্রবণতাও সম্পর্কিত।
কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ প্রার্থী অন্তত ৭০ শতাংশ জনগণের মাঝে ইমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, যেখানে বয়স্ক মানুষও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, কোনো ভ্যাকসিন ৫০ শতাংশ কার্যকর হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন, ভ্যাকসিন কেবল ভাইরাস প্রতিরোধ করার অনেকগুলো প্রক্রিয়ার একটি মাত্র। যেখানে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং মাস্ক পরার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।
এদিকে প্রথম পর্যায়ের ট্রায়ালে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে মডার্নার ভ্যাকসিন গ্রহণ করা প্রতি ৪৫ জনে চারজনের মাঝে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যেখানে একজনের অনেক জ্বর চলে এসেছিল এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। যদিও গবেষকরা এরই মধ্যে জানতেন যে এমআরএনএ ভ্যাকসিন কখনো কখনো ইমিউন সিস্টেমকে অতিরিক্ত উত্তেজক করে তুলতে পারে।
ধরা যাক কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অর্জন করেছে। সে সঙ্গে ঝুঁকি অতিক্রম করে এটি সুরক্ষা প্রদান করছে। কিন্তু তার পরও জনসংখ্যার অজানা একটি অংশকে ভ্যাকসিন নেয়ার ব্যাপারে রাজি করানো প্রয়োজন। মে মাসের একটি জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে তারা গ্রহণ করবে কিনা। যেখানে অর্ধেক লোক গ্রহণ করার কথা বলে। তবে অনেকেই দ্বিধান্বিত এবং অনেকেই না নেয়ার কথা বলছে। যেখানে অনেকের চিন্তায় কাজ করছে ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা। তাই গোটা প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সম্পন্ন
আনন্দবাজার/টিএসপি








