সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এই দীর্ঘ ১ মাস অচল ছিলো ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনে। গত শনিবার সন্ধ্যারাতে সেই আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণার মধ্যদিয়ে খুলেছে শাবিজট। সরাসরি পাঠদান ছাড়া গতকাল রবিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির আর সব স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হয়েছে। দীর্ঘ ২৭ দিন পর শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ নিজ কার্যালয়ে গিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে গত ১৩ জানুয়ারি দিনগত মধ্যরাতে ওই হলের ছাত্রীরা রাস্তায় নামেন। সেই থেকে আন্দোলনের সূচনা। একদিন পর (১৫ জানুয়ারি) আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে নতুন মাত্রা পায় আন্দোলন। হলের পুরো প্রভোস্ট কমিটির অপসারণ, অব্যবস্থপনা দূর, ছাত্রলীগের হামলার বিচার চেয়ে ১৬ জানুয়ারি শাবির আরও শিক্ষার্থী আন্দোলনে শামিল হন। সেদিন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে মুক্ত করতে গেলে পুলিশকে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে উপাচার্যকে মুক্ত করে পুলিশ। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ সে সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে। শিক্ষার্থীরাও ছুঁড়ে ইট-পাটকেল। সংঘর্ষকালে পুলিশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ অর্ধশতাধিক লোক আহত হন। এ সংঘর্ষের ঘটনায় তিন শ’ অজ্ঞাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ১৭ জানুয়ারি রাতে মামলা করে পুলিশ।
মামলার এজাহারে পুলিশ লিখেছে, সেদিন শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর গুলিও ছুঁড়েছিল। এ মামলা প্রত্যাহারে ১৮ জানুয়ারি রাত ১০টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। তবে মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ১৮ জানুয়ারি আরও উত্তপ্ত হয় শাবি ক্যাম্পাস। ওইদিন ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অপসারণ, প্রক্টর ও ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যাম্পাসে যান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলের সঙ্গে ছিলেন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ভিসি অপসারণের আশ্বাস না পেয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা। তারা উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে গণসাক্ষর সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বরাবরে চিঠি পাঠান।
আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯ জানুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময়ের মধ্যে ভিসি পদত্যাগ না করায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ওইদিন বিকেল ৩টা থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন ২৪ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একজনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। বাকি ২৩ জনের সাথে ২২ জানুয়ারি আরও ৫ শিক্ষার্থী যোগ দেন।
২১ জানুয়ারি দুই দফায় শাবি ক্যাম্পাসে যান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাদেল। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে। শিক্ষামন্ত্রী অনশন ভাঙতে ও আলোচনায় বসতে আহবান জানান শিক্ষার্থীদের। আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রথমে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও দুই ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা মত বদলে ফেলেন। তবে ২১ জানুয়ারি রাতে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় যায়। পরদিন (২২ জানুয়ারি) তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসায় বৈঠক করেন। বৈঠকের পর ২২ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে শাবির আন্দোলনরতদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি আন্দোলন থেকে সরে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর সেই অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি রাত পৌনে ৮টার দিকে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে বিকাল থেকে তাঁর বাসা ঘেরাও করা হয়। পরদিন (২৫ জানুয়ারি) রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় প্রদান করলেও আন্দোলনের অংশ হিসেবে অনশন চালিয়ে যেতে থাকেন ২৮ শিক্ষার্থী। তাদের অবস্থা সময় সময় খারাপের দিকে যেতে থাকলে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন শাবির সাবেক অধ্যাপক ড. মু. জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক। তাদের অনুরোধে ১৬৩ ঘণ্টা পর ২৫ জানুয়ারি সকাল ১০টা ২০ মিনিটে পানি পানের মাধ্যমে অনশন ভঙ্গ করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হককে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে, শাবিপ্রবি’র ছাত্র আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ৫ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল। পরে ২৫ জানুয়ারি বিকেলে তাদের সিলেট নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গ্রেফতারতৃরা হলেন- টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর দারিপাকা গ্রামের মতিয়ার রহমান খানের ছেলে হাবিবুর রহমান খান (২৬), বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানাধীন লক্ষ্মীকোলা গ্রামের মুইন উদ্দিনের ছেলে রেজা নুর মুইন (৩১), খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গার মিজানুর রহমানের ছেলে এএফএম নাজমুল সাকিব (৩২), ঢাকা মিরপুরের মাজার রোডের জব্বার হাউসিং বি-ব্লকের ১৭/৩ বাসার এ কে এম মোশাররফের ছেলে এ কে এম মারুফ হোসেন (২৭) কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন নিয়ামতপুর গ্রামের সাদিকুল ইসলামের ছেলে ফয়সল আহমেদ (২৭)। তাদের বিরুদ্ধে সিলেট জেলা তাঁতী লীগে সাংগঠনিক সম্পাদক লায়েক আহমদ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। তবে ২৬ জানুয়ারি তাদের জামিন প্রদান করেন আদালত।
১৩ দিনের টানা সহিংস আন্দোলন শেষে ২৫ জানুয়ারি দুপুর থেকে শাবি ক্যাম্পাস হয় উত্তাপহীন। তবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেওয়াললিখন, গ্রাফিতি অঙ্গনসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা। এ অব্স্থায় শাবি সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ছুটে আসেন সিলেটে। ওইদিন বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা মন্ত্রিদ্বয়ের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয় শিক্ষার্থীদের। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনার সময় আমরা মনযোগ সহকারে তাদের বক্তব্য শুনেছি। তাদের সব দাবি তারা উপস্থাপন করেন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে মেনে নেওয়া হয়েছে। তাদের মূল দাবি হচ্ছে উপাচার্যের পদত্যাগ বা অপসারণ। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেন মহামান্য আচার্য (রাষ্ট্রপতি), অপসারণও তাঁর হাতে। তাই শিক্ষার্থীদের দাবিটি আমরা মহামান্য আচার্যের কাছে পেশ করবো। যা সিদ্ধান্ত নেবার তিনিই নেবেন।
শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ওই বৈঠকের একদিন পর গত শনিবার সন্ধ্যারাত পৌনে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে প্রেস ব্রিফিং করে আন্দোলন থেকে সড়ে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। এসময় শাবির পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মুহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী আমাদের সকল দাবি মেনে নিয়ে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় তাদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আমরা আমাদের আন্দোলন আপাতত প্রত্যাহার করে নিলাম এবং আমাদের পেশ করা ৬টি দাবি পূরণের অপেক্ষায় থাকলাম। আমরা রবিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করার আহ্ববান জানাচ্ছি।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত’ উল্লেখ করে শনিবার এক বিবৃতির মাধ্যমে এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। একইসঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য সবাইকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। শনিবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার মো. ইশফাকুল হোসেন।
অপরদিকে, শাবি উপাচার্যকে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত শুক্রবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ক্যাম্পাসে গিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনিক ভবনে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী এ পরামর্শ দেন। বৈঠকে অন্য শিক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আলমগীর কবীরকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার অব্যাহতির বিষয়ে রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন বলেন, ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক কারণে আলমগীর কবীরকে প্রক্টর পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত ইবনে ইসমাইল নতুন প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে নতুন প্রক্টরকেও মেনে নিচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। নতুন আরেকজন প্রক্টরকে নিয়োগ দিতে তারা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী শাবিপ্রবির ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জহির উদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে নতুন ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক আমিনা পারভীনকে। গত রবিবার জহির উদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।









