- ৮ বছরে ১,১৯৯টি দুর্ঘটনা, মৃত্যু ২০৪
- ১৪৩৯টি গেইটের মধ্যে ৬২০টিতে নেই গেইটকিপার
- ২২২টি গেটইক্রসিং অবৈধ
- রেলক্রসিংগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে হবে
- রেলক্রসিংগুলোতে ওভারপাস বা আন্ডারপাস রাস্তা নির্মাণ করতে হবে
চলতি বছর ২৪ জানুয়ারি (সোমবার) সকাল সাড়ে ৮টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে অরক্ষিত একটি রেলক্রসিংয়ে ভুটভুটি অতিক্রম করার সময় ট্রেনের ধাক্কায় তিনজন মাছ ব্যবসায়ী নিহত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে অদুরেই এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর নীলফামারী সদরের বউবাজার রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনের নিচে কাটাপড়ে একই পরিবারের তিন শিশু চারজন নিহত হয়েছেন। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে রেলগেটে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণহানীর সিংহভাগই ঘটেছে লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময়। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১,৪৩৯টি লেভেল ক্রসিং এর অর্ধেকই অরক্ষিত। যার কারণে এসময় রেলক্রসিং এলাকায় প্রায় ঘটছে দূর্ঘটনা।
রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১৫৬৮ কিলোমিটার রেলপথে ১ হাজার ৪৩৯টি রেল ক্রসিং গেইটের প্রায় অর্ধেকই যেন মৃত্যুপুরী। প্রায় দেড় হাজার লেভেল ক্রসিংয়ে কাগজে-কলমে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮৯ জন গেটকিপারের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৭০০ জন গেটকিপার দায়িত্বে রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী- পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রায় অর্ধেক লেভেল ক্রসিং গেইট অরক্ষিত থাকায় ট্রেন দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।
রেলওয়ের পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগের আওতাধীন অনুমোদিত বা বৈধ লেভেল ক্রসিং (ট্রাফিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং) গেইট রয়েছে ৮০৮টি এবং অননুমোদিত বা অবৈধ গেইট রয়েছে ১২৩টি। আর লালমনিরহাট বিভাগে অনুমোদিত বা বৈধ লেভেল ক্রসিং গেইট (ট্রাফিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং) রয়েছে ৪১৭টি এবং অননুমোদিত বা অবৈধ গেইট রয়েছে ৯৯টি। সেই হিসেবে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতায় ১ হাজার ৪৩৯টি লেভেল ক্রসিং গেইটের ২২২টিই অননুমোদিত বা অবৈধ। আর এসব অননুমোদিত গেইটের মধ্যে এলজিইডির রয়েছে ১৮৪টি। এছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সওজের রয়েছে ৫টি। বাকিগুলো ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের অধীনে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১ হাজার ৪৩৯টি লেভেল ক্রসিং গেইটের জন্য মঞ্জুরিকৃত গেটকিপার ছিল ১৮৯ জন। এদের মধ্যে ১১৯ জন গেটকিপার স্বপদে কর্মরত। বাকি ৭০ জনকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, মঞ্জুরিকৃত ১৮৯ জন ছাড়াও প্রায় ৭০০ জন গেটকিপার প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছেন। হিসাব অনুযায়ী, ৬২০টি লেভেল ক্রসিং গেইটে কোনো গেটকিপার না থাকায় গেইটগুলো পুরোপুরি অরক্ষিত।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে বৈধ ও অবৈধ এসব লেভেল ক্রসিং গেইটের মধ্যে ৮১৯টিতে গেটম্যান থাকার কথা বলা হলেও এসব গেটম্যানের বিরুদ্ধে নানানভাবে দায়িত্বে অবহেলার কথা বলা হয়েছে। মঞ্জুরিকৃত ১১৯ জন গেটকিপার কোনোরকম তাদের দায়িত্ব কিছুটা পালন করলেও প্রকল্পের মাধ্যমে গেটকিপারের দায়িত্বে থাকা ৭০০ গেটকিপারের অধিকাংশই তাদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেন না। আবার যে লেভেল ক্রসিং গেটগুলোতে গেটম্যান নেই সেগুলোর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২২২টি ক্রসিংয়ের অধিকাংশের সামনেই নেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। ফলে অনেক সসময় পথচারিরা লেভেল ক্রসিং অতিক্রমের সময় অসাবধানতাবশতঃ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
গত দুই-তিন বছরে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ট্রেন ও ট্রাকের সংঘর্ষে ট্রেন চালক আব্দুর রশিদ সরকার ও সহকারী চালক ইউনুস আলী গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাদের দুজনকে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এর আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এমনই একটি অরক্ষিত ক্রসিংয়ে ২০১৯ সালের ২০ জুলাই দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ ১২ জন প্রাণ হারান। বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মাইর-প্যাচসহ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এভাবেই প্রতিনিয়ত ঘটছে রেল দুর্ঘটনা।
অরক্ষিত রেলক্রসিং এর বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রতিনিয়ত সরকারের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি কিংবা জনপ্রতিনিধি অবৈধভাবে লেভেল ক্রসিং গেইট তৈরি করছে। যার কারণেই প্রতিনিয়ত অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং গেইট বাড়ছে, ঘটছে দুর্ঘটনাও।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার বলেন, প্রতিনিয়ত যেখানে-সেখানে লেভেল ক্রসিং গেইট তৈরি হচ্ছে। এসব গেইটে ইচ্ছে করলেই রাতারাতি জনবল দেয়া রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সম্ভব না। অবৈধ লেভেল ক্রসিং যাতে তৈরি না হয় সেজন্য সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে স্থায়ী কিছু গেটকিপার রয়েছে।
তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, রেলক্রসিংগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, লেভেল ক্রসিং হবে রাস্তার সমান্তরাল। কিন্তু দেশের অধিকাংশ লেভেল ক্রসিং হয় উচু, নয়তো নিচু। এতে যানবাহন রেললাইন পার হতে সমস্যায় পড়ে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ‘ওভারপাস’ এবং ‘আন্ডারপাস’ তৈরি করা সম্ভব হলে দেশে লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুর মিছিল কিছুটা হলেও কমবে।









