- প্রজনন ভারসাম্য নিয়ে শঙ্কা
- হাঙ্গরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হচ্ছে বিভিন্ন দেশে
- মাছ ছেড়ে তাই হাঙ্গর শিকারে ব্যস্ত জেলেরা
- হাঙ্গর শিকার বন্ধে নীতিমালা জরুরি
মাছ ছেড়ে হাঙ্গর শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলের জেলেরা। মাছ শিকারের আড়ালে বিশেষ জাল দিয়ে প্রকাশ্যে সাগর থেকে হাঙ্গর শিখার করছেন তারা। একটি চক্র হাঙ্গরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চড়া দামে বিদেশে পাচার করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাঙ্গর শিকারের জন্য জেলেদের সরকারের অনুমতি নিতে হয়। অথচ বঙ্গপসাগরে হাঙ্গর শিকারে জেলেদের কোনো অনুমতি নিতে হয় না। কার্তিক থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত হাঙ্গরের প্রজনন মৌসুম। এ সময় বাচ্চা ছাড়ার জন্য হাঙ্গর গভীর সমূদ্র থেকে উপকূলমুখী হয়। জেলেরাও অপেক্ষায় থাকে। সমুদ্রউপক‚ল থেকে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার দুরে ব্যানানা শার্ক, হোয়াইট শার্ক, ব্লু-শার্ক, টাইগার শার্ক, হ্যামার হেডেড এসব প্রজাতির হাঙ্গর শিকারের জন্য জেলেরা স্থানীয় ভাষায় “লাউকক্যা” নামক এক প্রকার জাল এবং বড় আকৃতির বড়শি ব্যবহার করে। গভীরসমুদ্রে শাপলা পাতা মাছ আহরণের অজুহাতে বিশেষভাবে তৈরিকৃত এসব জাল জেলেরা হাঙ্গর শিকারের জন্য ব্যবহার করে। সমুদ্রে এ জাল ফেলার সময় জালের সঙ্গে হাঙ্গরের প্রিয়খাদ্য লইটক্যা নামক এক প্রকার মাছ জুড়ে দেয়া হয়। হাঙ্গর সমুদ্রের স্থীর প্রাণীকে খুব একটা টার্গেট করেনা। সাধারণত চলমান প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে বেশী পছন্দ করে। আর এ জন্য জেলেরা জালের সঙ্গে জুড়ে দেয়া মৃত লইটক্যা মাছ। লইটক্যা মাছ টার্গেট করে শাপলাপাতা মাছ এসে ফাঁদে আটকালে এর ঝাকুনিতে জালের অপরাপর মৃত লইটক্যা মাছ দুলতে থাকে। ফলে মৃত লইটক্যা মাছকে জীবিত ভেবে হাঙ্গর এসে সেগুলো আহার হিসেবে গ্রহণ করতে গিয়ে ধরা পড়ে জালে। আবার জীবিত লইটক্যা মাছ দিয়ে বড়শি ফেলেও ধরা হয় হাঙ্গর।
সাগর পাড়ের লেম্বুর চরের শুঁটকি পল্লীতে হাঙ্গর সনাতন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করতে দেখা যায়। কুয়াকাটার শুঁটকি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, হাঙ্গরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মূল্যবান। তাছাড়া প্রতিদিনই এর মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। হাঙ্গরের আকারভেদে দামে রয়েছে ভিন্নতা। ১৮০ থেকে ২০০ কেজি ওজনের হাঙ্গরের এক সেট ফিন (একটি মাছের কান, লেজ ও পাখনা) ২০০৬ সালে দেড় থেকে দু’ হাজার টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। প্রতিকেজি চামড়া ৮ থেকে ৯শ’ টাকার স্থলে ১ হাজার ৪ থেকে ৫’শ টাকা। ২০০৬ সালে হাঙ্গরের তৈরি শুঁটকি বিক্রি হতো ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বর্তমানে এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে আড়াইশ টাকা। হাড়ের কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকার স্থলে ১’শ ৮০ থেকে ২’শ টাকা। এক সেট দাঁত ২০০৬ সালে বিক্রি হতো আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার একড্রাম হাঙ্গরের তেল এখন বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায়। এমনকি এর নাড়ি-ভুঁড়িও ফেলনা নয়। তাও কিনে নেয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। হাঙ্গর বিক্রেতারা জানায় এর পিঠের ফলি এবং লেজের অংশদ্বারা স্যুপ তৈরি হয়। তেল সাবান ফ্যাক্টরি ও হাঁস-মুরগীর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চামড়া দ্বারা তৈরি হয় জ্যাকেট ও বেল্ট। এক্ষেত্রে হাঙ্গরের শরীর থেকে চামড়া ছাড়াতে হয় খুব সতর্কতার সঙ্গে। কোন রকম ছিড়ে বা কেটে গেলে সে চামড়া আর ব্যবসায়ীরা কিনেন না। তখন তা শুঁটকির উপাদানে পরিণত হয়। দেহের বাকিঅংশ উপজাতীয়রা খাবার হিসেবে গ্রহণ করে।

কুয়াকাটায় আসা চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী সীমান্ত সাহা জানান, তারা হাঙ্গরের এসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ চট্টগ্রাম নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীর কাছে তা বিক্রি করেন। সেখান থেকে পাচার করা হয় মায়ানমার, থাইল্যান্ড, হংকং, কোরিয়া, জাপান এবং মালয়েশিয়ায়। তবে মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে সরাসরি সমুদ্র উপক‚ল থেকেও হাঙ্গর পাচার হয়।
পটুয়াখালী সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পীযুষ কান্তি হরি বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ১০ প্রজাতির হাঙ্গর পাওয়া যায়। প্রজাতিগুলো হচ্ছে চিতা, বাঘা, হাতুড়ি, তানি, নাকচোখা, কলা, নীল, ফৌড়ি, করাত ও কানি হাঙ্গর। এর মধ্যে কলা, করাত ও নীল প্রজাতি বেশী। মাংসাশী এ হাঙ্গর সাগরে ব্যাপক বংশবিস্তারকারী বিভিন্ন স্তরের মাছ খেয়ে মাছের প্রজননের ভারসাম্য কিংবা সাম্য বজায় রাখার স্বার্থে হাঙ্গর ধরা বন্ধ করা খুবই জরুরি। এর বর্জ্য সাগরের উপরের স্তরে উঠে পানির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। ফলে সাগরের বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদকের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদকের উপর নির্ভরশীল পরবর্তী ট্রপিক স্তরগুলো প্রাণীর প্রজননের (প্রজাতির সংখ্যা) ভারসাম্য বজায় রাখে। এর সংখ্যা কমে গেলে ছোট মাছের সংখ্যা একতরফাভাবে বেড়ে যাবে। হারিয়ে যাবে অনেক প্রজাতির মাছ।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে গৌণ মাংসাশী প্রাণী দখল করে নেবে হাঙ্গরের জায়গা, বেড়ে যাবে অচেনা মাছের সংখ্যা। সুতরাং সাগরের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা, উৎপাদক বাসকারী অঞ্চলে উর্বর শক্তি বজায় থাকা, প্রত্যেক ট্রপিক স্তরে মৎস্য প্রজনন টিকে থাকা, সর্বোপরি আমাদের উত্তর পুরুষের জন্য সাগরের মাছের এ বিপুল সম্ভার রক্ষা করার স্বার্থে হাঙ্গর শিকার বন্ধ করা সহ সরকারি ভাবে নীতিমালা তৈরী করা জরুরি।
আনন্দবাজার/এম.আর








