ধীরে ধীরে ৯৭ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন: নির্বাহী চেয়ারম্যান, বেজা
অচিরেই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে জানিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে সার্বক্ষণিক গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়ার যাবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০টি শিল্প ও অবকাঠামোর উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর উপলক্ষে গতকাল রবিবার পুরানা পল্টনে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যে তেল পাওয়ার কথা ছিল তা আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েলের জন্য আপাতত যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে, তার কারণে আমরা সমস্যায় আছি। কিন্তু অচিরেই এ সমস্যা শেষ হয়ে যাবে।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, আমরা সরকারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। যে কয়টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গিয়েছে, তাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। গ্যাসের বিকল্প যে এলএনজি বা অন্যান্য যে মাধ্যম ছিল, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে সেটি হয়তো আমরা আপাতত দিতে পারছি না। কিন্তু গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিক পাওয়ার বিষয়ে সরকারে কাছ থেকে আমরা প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। আমি মনে করি, গ্যাস এবং বিদ্যুতের সমস্যা হবে না।
অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার প্রসঙ্গে শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, আমরা যে খাসজমি পেয়েছি, সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল করবো। পঞ্চগড়ে জায়গা আছে ২০০ একর। কুষ্টিয়ায় জায়গা আছে ১৫০ একর। আমরা সাতক্ষীরায় কিছু জায়গা পেয়েছি। খাসজমিগুলোতে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে অনেক অর্থের দরকার হয়। বিভিন্ন দাতা সংস্থা, এনজিওর কাছ থেকে লোন নিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করি। ধীরে ধীরে আমরা ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করবো। আপাতত খাসজমির ওপর আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো করবো।
নেত্রকোনায় একটি জমি পেতে আমাদের ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লাগবে জানিয়ে শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, সরকারের এমন পরিস্থিতি নাই যে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চাইলেই দিয়ে দেবে। সুতরাং আমাদের ডোনার বা দাতা প্রতিষ্ঠানের সংস্থান করতে হবে টাকার জন্য। অতএব সবগুলো একবারে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। সবগুলো একবারে বাস্তবায়ন করতে গেলে বাংলাদেশের বাজেটের অতিরিক্ত টাকা লাগবে।
সভায় শেখ ইউসুফ হারুন লিখিত এক বক্তব্যে জানান, ২০১৯ সালের পর থেকে ইকোনমির জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দশটি অঞ্চল কার্যক্রম শুরু করেছে। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর, শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে এ যাবৎ প্রায় ২২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এথেকে আরও ২৮টি অঞ্চল ইতোমধ্যে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চলমান রয়েছে।
এছাড়া ১২টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক শিল্পোৎপাদন শুরু করেছে। আরও ৬১টি শিল্প নির্মাণাধীন রয়েছে। এ অঞ্চলগুলোতে উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে জাপান, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়েসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। বেজা ঝামেলামুক্ত ব্যবসা পরিচালনার জন্য ওএসএস আইন, ২০১৮ প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের প্রথম ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) সেন্টার চালু করেছে। বর্তমানে বেজা ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) সেন্টার থেকে বিনিয়োগকারীদের ১২৫টি পরিষেবা প্রদান করছে। যার মধ্যে ৪৮ টি পরিষেবা অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে প্রথমবারের মতো উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ৪টি শিল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। যার মধ্যে রয়েছে ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের নিপ্পন, বাংলাদেশ ম্যাকডোনাল্ড ও টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রথমবারের মতো উদ্বোধন হতে যাচ্ছে একটি কারখানা ডাবল গ্লেজিং লিমিটেড। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আরও ৯টি শিল্প ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে যাচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ পিভিসি কারখানা। সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১৪টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাণিজ্যিক আত্মপ্রকাশের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এই লক্ষ্যে ১৪টি শিল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ৯৬৭ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। ব্যবসা সম্প্রসারণে আরও ৩৩১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৭ হাজার ৪৫৬ জন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
সভায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগ চিত্র তুলে ধরে বেজার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানান, পাঁচ শিল্প অঞ্চলে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর, শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক) বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১৭৭ এবং বরাদ্দ দেওয়া জমির পরিমাণ ৬০৮৪ দশমিক ৭৯৯ একর। এই পাঁচ শিল্প অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে ২ হাজার ২১৭ কোটি ৩১ লাখ ৭৭ হাজার মার্কিন ডলার। আর প্রস্তাবিত কর্মসংস্থান ৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৪১ জনের।
এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে ১৩৬ বিনিয়োগকারীর কাছে থেকে ১ হাজার ৭৮৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার, শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬ বিনিয়োগকারীর কাছে থেকে ১৩০ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার ডলার, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫ বিনিয়োগকারীর কাছে থেকে ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩ বিনিয়োগকারীর কাছে থেকে ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার এবং সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে ১৭ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ২৭ কোটি ১১ লাখ ৮ হাজার ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
মতবিনিময়ে উপস্থিতি ছিলেন বেজার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও অর্থ) ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বঙ্গবন্ধু শেক মুজিব শিল্প নগরের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক।









