- দাবি আলু চাষিদের
মুন্সীগঞ্জের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই হিমাগারগুলোতে আসতে শুরু করেছে প্রচুর পরিমাণ আলু। তবে এ সমস্ত আলু অধিকাংশই আসছে উত্তরবঙ্গ থেকে। যদিও এখনো মুন্সিগঞ্জে পুরোপুরি আলু উত্তোলন শুরু হয়নি।
মুন্সিগঞ্জের পাইকাররা উত্তরবঙ্গের রাজশাহী দিনাজপুর, নাটোর, রংপুর থেকে আলু কিনে এনে হিমাগারে সংরক্ষণ করছেন। মৌসুমের শুরুতে বাজারে আলুর দর কিছুটা কম থাকায় প্রতিবছর এখানে উৎপাদিত বিপুল পরিমান আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি অন্য জেলা থেকে আলু এনে এ জেলার হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। আলুর চাহিদার সঙ্গে দর বৃদ্ধি পেলে হিমাগার থেকে বাজারে আলু সরবরাহ করেন কৃষক ও ব্যবসায়িরা। আলু উৎপাদনের তুলনায় কৃষকের সংরক্ষণের জায়গা স্বল্পতার কারণে প্রতিবছর হিমাগারে আলু রাখতে কৃষকরা ভিড় করেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবছরই মালিকেরা হিমাগারে আলু রাখার ভাড়া বাড়িয়ে দেন।
সিদ্ধেশ্বরী হিমাগারের ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, এখনো মুন্সিগঞ্জের আলু উত্তোলন শুরু হয়নি। তাই রাজশাহী, দিনাজপুর থেকে আলু কিনে এনে হিমাগারে রাখতেছি। চলতি বছর ওই অঞ্চলের জমিতে ১৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। কোল্ডস্টোরেজের ভাড়াসহ ২০ থেকে ২১ টাকা প্রতিকেজি আলু পড়বে। গত বছর আলুর দাম কম হওয়ায় লোসকান হয়েছে।
আলু ব্যবসায়ী রিপন বলেন, গতবছর লোসকান হয়েছে। এবার আবার আলু কিনে রাখতেছি। প্রতিকেজি আলু এখন রাজশাহী, দিনাজপুর থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে কিনে আনছি।
মুন্সিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ৮শ’ হেক্টরে আলু আবাদ হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রতি হেক্টরে ২৫ টন করে আলু পাওয়া গেছে। সে হিসেবে চলতি বছর ৮ লাখ ৯৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হতে পারে।
জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য ৬৪টি সচল হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারের সাড়ে পাঁচ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা যাবে। এতে প্রায় ৩ লাখ টন আলু সংরক্ষণের বাহিরে থাকে।
বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোসারফ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, জেনারেটর চার্জ, হিমাগার লোড-আনলোড খরচ, লেবার খরচ ও আনুষঙ্গিক খরচসহ হিমাগারে প্রতিকেজি আলু সংরক্ষণের নূন্যতম ৪ টাকা ৮০ পয়সা ব্যয় হয়। গত বছর হিমাগারে আলু সংরক্ষণের জন্য কেজি প্রতি ৫টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। চলতি বছর খরচ বেশি হওয়ায় আরো ২৫ পয়সা বেশি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এর কম হলে লোকসান গুনতে ছাড়া উপায় থাকবেনা।
দেওয়ান কোল্ড স্টোরেজের মালিক আরশ দেওয়ান বলেন, তার হিমাগারে সাত লাখ বস্তা আলু রাখা হয়। গত বছর ৫০ কেজির বস্তা ২০০ টাকা করে ভাড়ায় রাখা হয়েছিল। এবারও এ ভাড়ায় রাখা হবে।
মাল্টিপারপাস হিমাগারের মালিক গোলাম মোস্তাফা বলেন, গত বছর ৫২ থেকে ৫৫ কেজির বস্তা হিমাগারে রাখতে ২৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। চলতি মৌসুমে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম বলেন, আমাদের হিমাগারে ১ লাখ ৭০ হাজার বস্তা আলু রাখা হয়।
শুনেছি বিদ্যুৎ বিল আগের চেয়ে বাড়ানো হবে। সেটার উপর ভিত্তি করে হয়তো ভাড়া নির্ধারণ হবে। আগের চেয়ে বাড়বে কিনা সেটা এখনো নিশ্চিত না। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী এলাকার আলুচাষি ইকবাল হোসেন বলেন, এমনিতেই গত মৌসুমে আলুতে অনেক বড় লোকসান হয়েছে। আলুর দাম কম। অন্যান্য খরচ বেশি। ৫০ কেজির বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে ২০০ টাকার বেশি নেওয়া হলে সেটা জুলুম হবে।
আলুতে লোকসান কমিয়ে আনার বিষয়ে কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোসারফ হোসেন আরো বলেন, ১০-১৫ বছর আগে মুন্সিগঞ্জ জেলায় ব্যাপক আলুর উৎপাদন হতো। সে হিসেবে মুন্সিগঞ্জে অসংখ্য হিমাগার গড়ে ওঠে। তবে এখন দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আলুর ব্যাপকভাবে আবাদ শুরু হয়েছে। এর ফলে দেশে আলু উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। আলু সংরক্ষণের পরেও অনেক আলু থেকে যাচ্ছে। এতে আলুর দাম কমে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছরই কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের মোটা অংকের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকারের উচিত আলুকে শিল্পে রূপ দেওয়া। আলু ভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। ভাতের বিকল্প হিসেবে আলুকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা। সবশেষে যে বছর আলুর উৎপাদন বেশি হবে, তখন ভর্তুকি হিসেবে আলু কিনবে সরকার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক খুরশিদ আলম দৈনিক আনন্দ বাজারকে বলেন, দেশে আলুর ভবিষ্যৎ ভালো নয়। দেশে যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় ৪০ ভাগ বেশি। বিদেশে আলু রপ্তানি করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় আলু বেশি হওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া বাড়ানো হলে কৃষকরা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।









