রাস্তার পাশেই বাগানে সারি সারি বাক্স। বাক্সের চারপাশে উড়ছে চোখে পড়ার মত অসংখ্য মৌমাছি। নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত সেই মৌ মাছি মৌ মাছি কবিতাটির মতো মধু আহরণে মৌমাছির ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। মৌমাছিকে এখন আর দূরের কোন বন-বাগানের খোঁজে দীর্ঘ পথ উড়ে যেতে হয় না। বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি পালনকারীদের দেখা মেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের ফুল ফোটা জমির কাছে।
এমনই একজন মৌচাষি নজরুল ইসলাম। বগুড়া সদরের তেলিহারা গ্রামে বসিয়েছেন বিভিন্ন আকৃতির মৌমাছির কলোনী (বাক্স)। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরেই তিনি পার করছেন সারাবছর। মাত্র ৫০হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করার মৌচাষি নজরুল ইসলাম মধু চাষ করে প্রতিবছর আয় করছেন প্রায় ২লক্ষ টাকা।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে একটি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বানিজ্যিকভাবে মৌচাষ শুরু করেন। বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও উপযোগী পরিবেশের কারণে বছড়জুড়ে অবস্থায়ন করতে হয় কয়েকটি অঞ্চলে। বগুড়া সদরের তেলিহারা গ্রামে সকলধরণের সবজি চাষ হওয়ায় গত ৬বছর যাবৎ নির্দিষ্ট মৌসুমে মৌমাছির কলোনিগুলো নিয়ে তিনি এখানে অবস্থান করেন। নজরুল ইসলাম জানান, একবছরে মৌচাষের প্রয়োজনে সময়ভেদে ৬ অঞ্চলে অবস্থান করতে হয়। সাধারণত সরিষা মধু, ধনিয়া মধু, কালোজিরা মধু, লিচু মধু, সুন্দরবন মধু ও তিল মধু চাষ করেন প্রতিবছর। মুলত বগুড়ার এই এলাকায় সবজিফুলের রেণুর কারণে মৌমাছিগুলো ভালো থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পরবর্তী ধাপের জন্য মৌমাছিসহ কলোনিগুলো নিয়ে অন্য এলাকায় যেতে হবে।
মৌচাষের জন্য চাষিরা ভালো ফসলি এলাকা নির্বাচন করেন। ফুল থেকে ফসল হয় জমির পার্শ্ববর্তী কোনো বাগানই সাধারণত কলনিগুলো স্থাপন করেন। প্রতিটি কলোনি বা বাক্সে রয়েছে ৭ থেকে ১০টি ফ্রেম। প্রতিটি বাক্সে ১টি করে রাণী মাছি ১০০ করে পুরুষ মাছি ও তার সাথে ১ লাখ শ্রমিক মাছি থাকে। রাণির কাজ হলো ডিম দেওয়া। শুধুমাত্র শ্রমিক মৌমাছিগুলো ফসলি জমির ফুলের রেণু থেকে মধু সংগ্রহে যায়। মৌমাছিগুলো দিনভর মধু এনে জমা করেন নির্দিষ্ট বাক্সে। আর সুযোগ বুঝে সেই বাক্স থেকে সুকৌশলে মধু কেটে নিয়ে যান চাষী । বিভিন্ন এলাকায় গুচ্ছ বক্স স্থাপন করে শুধু যে মধু আহরিত হয় তা নয় ফুলে ফুলে মৌমাছির উড়ে বেড়ানোতে যে পরগায়ন হচ্ছে তাতে ঐ এলাকার ফসলে বামপার ফলনও হচ্ছে। অর্থাৎ মৌমাছি চাষে দুই দিকেই লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। দিনভর মৌমাছির ছুটাছুটি দেখতে ছুটে আসে বিভিন্ন এলাকার লোকজন।
তেলিহারা গ্রামের যুবক শাহ আলম জানান, ছোটবেলায় বড় বড় গাছের ডালে মৌমাছির চাক দেখা যেত। কৃত্রিমভাবেও যে মৌমাছি চাষ করা যায়, এটা কখনো ভাবনায় ছিল না। প্রায় কয়েকবছর যাবৎ এই মৌচাষি আমাদের এলাকায় আসেন। এলাকায় সুন্দর পরিবেশ তৈরী হয়। এছাড়া ফুল থেকে হওয়া ফসলগুলো আগের তুলনায় এই এলাকায় ভালো উৎপাদন হচ্ছে।
মৌচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ১০০ কলোনিতে(বাক্স) প্রতি মৌসুমি ৩জন কর্মচারী প্রয়োজন হয়। চাষ শেষে ১০০টি বাক্স থেকে প্রত্যেক সিজনে প্রায় ৩ টন মধু সংগ্রহ করি। এরপর পাইকারী দরে বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে বিক্রয় করি। প্রতিবছর সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা লাভ থাকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রকৃতির সাথে কাজ করে মানসিক একটা তৃপ্তি পাই সবসময়।’
নজরুল ইসলাম ছাড়াও বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় অনেক মৌচাষি আসেন প্রতিবছর। তারা লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে সাবলম্বী হচ্ছেন। বাজারে খাটি মধুর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও তার সন্ধান পাওয়া বেশ কঠিন। এরকম প্রশিক্ষন নিয়ে যদি নতুনরা বানিজ্যিক ভাবে মধু চাষ করেন তাহলে বেকার সমস্যার সমাধাণের পাশাপশি অর্থনৈতিক লাভবান হওয়া সম্ভব।









