সর্বজনীন পেনশন: বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তা
- পাঁচ লাখ সঞ্চয়ে দেড় কোটি টাকা
- মূলনীতি তৈরির আগে কিছু বলা যাচ্ছে না: অর্থনীতিবিদরা
দেশের প্রতিটি নাগরিকের বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তামূলক জীবনধারণে সরকার সর্বজনীন পেনশন প্রথা চালু করতে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে এটি চালু করতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে ৫ লাখ টাকা জমা দিয়ে দেড় কোটি টাকা পেনশন পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কৌশলপত্রটি তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, গণমাধ্যমের সংবাদে যা পড়েছি তাতে দেখা যায় সর্বজনীন পেনশনে সর্বনিম্ন চাঁদা ১০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। এই হার কমানো দরকার। যাতে দারিদ্রসীমার নিচের মানুষরাও সেটা বহন করতে পারে।
৪২ বছরে এক হাজার টাকা করে জমা দিলে ৫ লাখ ৪ হাজার টাকা সঞ্চয় হয়। এই সঞ্চয়ের বিপরীতে পেনশন হিসেবে দেড় কোটি টাকা দেয়া বা পাওয়া সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে মির্জ্জা আজিজুল বলেন, এটি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কেননা মূল নীতিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বলা যাচ্ছে না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান আনন্দবাজারকে বলেন, এটি ভালো দিক যে সর্বজনীন পেনশন প্রথা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে অর্থমন্ত্রী যে হিসাব দিয়েছেন সেটি কম বেশি হতে পারে। কেননা এই অর্থের পরিমাণ আনুমানিকভাবে দেয়া হয়েছে।
ড. আতিউর বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সাধারণ মানুষের আওতায় যাতে থাকে সেটি যেন প্রাধান্য দেয়া হয়। তবে এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
দেশের প্রত্যেক নাগরিক নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছামাত্র সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত নির্ধারিত হারে পেনশন পাওয়াই হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে চালু করা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের অবসর সুবিধার বিধান রয়েছে। যেমন- সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা নিয়মিত শতভাগ পেনশন পান অবসরে যাওয়ার পর।
অনেক স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পেনশন সুবিধা না থাকলেও রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির সুবিধা। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন- ব্যাংক, বিমা এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আছে প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটির সুবিধা। বাকিদের কোনো অবসর সুবিধাই নেই। এ রকম ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পেনশন সুবিধা বহাল রেখে সর্বজনীন পেনশন চালু করা এক দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থমন্ত্রীর দেয়া হিসেবটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ৪২ বছরে ৫০৪ মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা জমা দিলে ৫ লাখ ৪ হাজার টাকা সঞ্চয় হবে। সেখানে সরকার তাকে ৮০ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ২০ বছর প্রতিমাসে ৬৪ হাজার ৭৭৬ টাকা করে পেনশন দিবেন। তাতে বছরে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩১২ টাকা ও ২০ বছরে এক কোটি ৫৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৪০ টাকা পেনশন পাবেন।
কেউ যদি ৩০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৩০ বছর অর্থাৎ ৩৬০ মাস এক হাজার টাকা করে জমা রাখে তবে তিনি ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারবেন। সেখানে তাকে ৬০ বছর পর প্রতিমাসে ১৮ হাজার ৯০৮ টাকা করে পেনশন দেয়া হবে। তাতে করে বছরে সেই ব্যক্তি পাবেন ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৯৬ টাকা। তিনি ৩০ বছরে পাবেন ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৮৮০ টাকা। আর যে ব্যক্তি ১০ বছর অর্থাৎ ১২০ মাস ১০০০ টাকা করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা সঞ্চয় করবেন তার ব্যাপারে কত টাকা দেয়া হবে তা নির্ধারিত হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ভোগ করছে। আমাদের বর্তমান গড় আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর যা ২০৫০ সালে ৮০ বছর এবং ২০৭৫ সালে ৮৫ বছর হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় আগামী তিন দশকে একজন কর্মজীবী ব্যক্তি অবসর গ্রহণের পরও গড়ে ২০ বছর আয়ু থাকবে। দেশে বর্তমানে ডিপেনডেন্সি রেশিও ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে ২৪ শতাংশে এবং ২০৭৫ সালে ৪৮ শতাংশে উন্নীত হবে। গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান ডিপেনডেন্সি রেশিও বিবেচনায় বৃদ্ধ বয়সীদের নিরাপত্তা হিসেবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা খুবই জরুরি।









