শিল্পকলা একাডেমির ‘ড্যান্স অ্যাগেইন্স্ট করোনা’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় তিনদিনের জাতীয় নৃত্য উৎসব ২১-২৩ জানুয়ারি সমাপ্ত হলো। এ উৎসবে ৭৫টি মৌলিক নতুন নৃত্য সৃজনের লক্ষ্যে একাডেমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে। প্রতিটি দলে ন্যূনতম ১০ জন করে নৃত্যশিল্পী কাজ করেছেন। আবার কোনো কোনো দলে ২০-৩০ জন নৃত্যশিল্পীও অংশ নিয়েছেন। ৭৫টি নৃত্যদলের অংশগ্রহণের প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে এ উৎসব শুরু হয়।
এ উৎসবের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি মিনু হক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় নৃত্য উৎসবের নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। বিশেষ করে শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দীক্ষা নৃত্যদল সদস্যদের ‘সোহাগপুরের স্মৃতি’ বেশ সাড়া ফেলল জাতীয় নৃত্য উৎসবে। মামুন-উর-রশীদের গবেষণায় নৃত্যটি পরিচালনা করেছেন সুইটি দাস চৌধুরী।
সোহাগপুরের স্মৃতি দেখা যায় : শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়নের নাম কাকরকান্দি। গারো পাহাড়ের কোল ঘেষে নিভৃত এই গ্রামের নাম সোহাগপুর। কৃষির উপর নির্ভর করে এদের জীবিকা চলে। ১৯৭১ সাল। ২৫ জুলাই। সকাল আটটা। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারিরা প্রবেশ করে। নির্বিচারে গুলি চালায় মাঠে কর্মরত কৃষকদের ওপর। স্থানীয় প্রফুল্ল দীঘি থেকে শুরু করে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা চলে গণহত্যা। বাড়ি বাড়ি প্রবেশ করে পাকিস্তান মিলিটারিরা হত্যা করতে থাকে একের পর এক। এই গ্রামেরই একজন সমলা বেওয়া। তিনি বললেন- ২৫ জুলাই ১৯৭১ এর কথা-
এইদিনে অর্ধশতাধিক নারীকে দিতে হয় চরম আত্মত্যাগ। জ্ঞান হারান প্রত্যেকেই। আসরের পর জ্ঞান ফিরে এলে তারা কোনো রকম উঠে দেখেন বাবা, স্বামী, ভাই-ভাসুরের বুলেটবিদ্ধ লাশ! এতো লাশ কেউ কোনো দিন দেখেনি। ১৮৭ টি লাশ, বুলেট ও বেয়োনেটবিদ্ধ। চিন্তায় পড়লেন এতো লাশ দাফন করবেন কিভাবে? সোহাগপুরের কন্যারা ধীরে ধীরে উঠে দাাঁড়ান কোনো রকম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা প্রিয়-স্বজনদের লাশ টেনে টেনে কোনো রকমে গর্ত কওে কেউবা কাপড়-মশারী পেঁচিয়ে মাটি চাপা দিলেন পথের পাশেই। না গোছল। না কাফনের সাদা কাপড়। না জানাজা। এক কবরে কোথাও একজন, কোথাও তিনজন, কোথাও চারজন, কোথাও সাতজন।
সোহাগপুরের করফুলি, নূরেমান, সমলা, জমিলা, হাজেরা, ফাতেমা, জরিতন, ওজুবা, ছাহারা, হাসেন বানু, হাসনা, জোবেদা, লাকজান এরা কেউ আজও জানেন না- কেন তাদের প্রিয় মানুষদের এভাবে হত্যা করা হলো? কেন তাদের জীবনটা ভেঙে চুরমার করে দিল। সমাজ-সংসার থেকে তাদের জীবনটা অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো। ছোট্ট একটি ঘরে কেবলই স্বামীর স্মৃতিটুকু নিয়ে জানালা দিয়ে শুধুই পথের দিকে চেয়ে থাকা মন যখন আর মানে নাÑ তখন কবরের পাশে বসে কেবলি হু হু কান্না।
নৃত্য যে মানুষের মনোজাগতিক প্রকাশ ভঙ্গির অন্যতম নাম ও মাধ্যম, আয়োজনের শুরু থেকে তাই যেন আবারও প্রমাণ রেখে গেলেন পরিবেশনার সব নৃত্যশিল্পী। মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একাধিক পরিবেশনায় তারা দেখিয়ে গেলেন জয়ের আলোকবর্তিকায় নৃত্য ভাষার রূপ।
আনন্দবাজার/এম.আর









