- শৈতপ্রবাহে কাবু উত্তরের মানুষ
- নিচে নামছে তাপমাত্রার পারদ
- সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল
পৌষের শুরুতে শীতে কাঁপছে উত্তরাঞ্চল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর হিমালয়ের হিম বাতাসে কাহিল হয়ে পড়েছে জনজীবন। শীতের দাপট থাকছে সকাল পর্যন্ত। প্রতিদিনই নামছে তাপমাত্রা। এতে শ্রমজীবিসহ নদীপারের মানুষ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। সন্ধ্যার পর হাট-বাজার, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকায় যেন স্তব্ধ হয়েছে গোটা অঞ্চল। গত তিনদিন ধরে রংপুরে সর্বনিম্ম তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। দেশের সর্বনিম্ম তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়।
করোনাকালে এমনিতে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। দৈনন্দিন সংসার চালানোর পরে শীতবস্ত্র কেনার মত টাকা থাকছে না তাদের। ফলে কয়েকদিন ধরে ঘন কুয়াশাসহ ঠান্ডার প্রকোপ এ অঞ্চলের জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দুর্ভোগ বেড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের। বিশেষ করে উত্তরের ১৬ জেলার প্রায় ৩২ লাখ দরিদ্র শীতার্ত ও ২০ লাখ শ্রমজীবি মানুষ রয়েছে বেকায়দায়। এসব জেলায় শীতজনিত রোগবালাইও বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। আবাহাওয়া অফিস জানায়, কয়েকদিন ধরে এ অঞ্চল শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকছে। দু’এক দিনের মধ্যে জেঁকে বসবে শীত। শুরু হবে শৈত্যপ্রবাহ। আশঙ্কা করা হচ্ছে এ অবস্থা চলতে থাকলে এবার অন্য যে কোন বছরের তুলনায় শীতের তীব্রতা একটু বেশি হবে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র পাওয়া না গেলে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ দুর্ভোগে পড়বে সবচেয়ে বেশি।
সরেজমিনে গতকাল সন্ধ্যায় রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রচন্ডশীতে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে জনপদ। শীতে অভাবী মানুষজনের জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।
তিস্তাপারের ধামুর এলাকার সত্তুর বছরের আব্দু রহমান বলেন, ‘নদীপারের ঝুপড়ি ঘরোত হু হু করি বাতাস ঢোকে। ঠান্ডায় সারা রাইত নিন (ঘুম) ধরেনা।’
একই এলাকার শহর বানু ও মজিদা বেগম বলেন, ‘মাঘের জারে (মাঘ মাসের ঠান্ডায়) বাঘ কাঁন্দে সবায় কয়, তয় এবার আগেভাগেই ঠান্ডা শুরু হইলো। হামার কাঁন্দন কাইও দ্যাকে না।’ হঠাৎ করে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের অভাবী মানুষজন। সন্ধ্যার পর পশ্চিমা বাতাসে প্রচন্ড ঠান্ডায় মানুষজন ঘরের বাহির হতে না পারায় রাস্তা-ঘাট ও হাট-বাজার ছিল অনেকটাই ফাঁকা।
নগরীর চব্বিশ হাজারী এলাকার দিনমজুর শমসের আলী বলেন, ‘কয়দিন থাকি এমন ঠান্ডায় শরীল (শরীর) দুর্বল হয়া গেইছে। ঠান্ডার কারণে মাইনসের কাম (অন্যের কাজ) না পায়া বউ-ছাওয়া নিয়া খুব কষ্টে আছি।’ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীতজনিত কারণে আগের চেয়ে রোগির সংখ্যা বেড়েছে। আক্রান্ত রোগির মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু ও বয়স্করা। তারা হাঁপানি, নিমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম কামরুল হাসান জানান, ঘন কুয়াশা অর্থাৎ মেঘ কেটে গেলে দু’এক দিনের মধ্যে এ অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সেসময় তাপমাত্রা আরো কমবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রংপুর জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন অফিসার আখতারুজ্জামান জানান, জেলার আট উপজেলা, সিটি করপোরেশনসহ তিনটি পৌর এলাকায় শীতবস্ত্র কিনতে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন ১৫ লাখ, হারাগাছ, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ পৌরসভা দুই লাখ ৫০ হাজার, আট উপজেলায় ৮৫ লাখ ও জেলা প্রশাসন ৮ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি জেলায় যে পরিমান শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল তার বিপরিতে বরাদ্দ এসেছে খুব সামান্য। প্রত্যেক জেলায় গড়ে চাহিদা রয়েছে এক লাখ পিছ শীতবস্ত্র। তবে জেলা প্রশাসক আসিব আহসান জানান, শীত দুর্যোগ মোকাবেলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। শীত জেঁকে বসার আগেভাগেই প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ৫২ হাজার ৬০০ পিছ কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।
আনন্দবাজার/এম.আর









