ভ্যাট প্রত্যাহারের পর আবারও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে ভোজ্যতেলের বাজার। গত কয়েক বছরে ৭০ টাকা লিটারের সয়াবিন দফায় দফায় বেড়ে ১৫০ টাকা লিটারে পৌঁছায়। চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রমজান ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ফলে আরও কয়েক দফায় সয়াবিনের দাম বেড়ে প্রতি লিটার সয়াবিন বিক্রি হয় দুইশ’ টাকা থেকে তারও উর্ধে। এতে ভোক্তারা পড়ে বিপাকে। আন্তর্জাতিক বাজার ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দেশীয় বাজারে তেলের দামের বৃদ্ধিকে দায়ী করলেও মুলত সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন তেল ব্যবসায়ীরা।
সিন্ডিকেটের অতিমুনাফার লোভে সয়াবিনের দাম দফায় দফায় বাড়তে থাকে। সয়াবিনের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সারাদেশে ভোক্তা আন্দোলন শুরু হয়। ভিভিন্ন সংগঠনও ভোজ্যতেলের দাম কমানোর দাবি তোলেন। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেয়। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও একই দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায়ে ভোজ্যতেলের ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়। এতে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এরপর বাজারে খোলা তেলের দাম ১৬০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। হঠাৎ সেই ১৬০টাকা লিটারের সয়াবিন লাগামহীনভাবে বেড়ে বর্তমানে রোজার মাঝখানেও বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা লিটার। মফস্বল বাজারগুলোতে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা লিটার পর্যন্ত।
মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের বিভিন্ন বাজারে ভোজ্য তেলের খুচরা বিক্রির তথ্য নিয়ে দেখা গেছে রমজানের শুরুতে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও রমজানের মাঝে লাগামহীনভাবে সয়াবিনের দাম বাড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০টাকা লিটারে। যা রমজানের শুরুতে ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবী, প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম গড়ে পাইকারী ক্রয়মূল্য বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা । রমজানের শুরুতে প্রতি লিটার সয়াবিন ১৬০ টাকায় বিক্রি করা যেতো। যা বেড়ে ১৯০ টাকা লিটারে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া অনেক দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে এগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছে বাড়তি দামে বিক্রির আশায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, বাজারে তেলের সরবরহ কমের দোহাই দিয়ে তেলের পাইকারি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে একটি অসাধু চক্র। বাড়তি দামেও প্রয়োজন মতো সয়াবিন পাচ্ছেন না তারা। ফলে আবার তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
গত ২০ মার্চ তেল আমদানিকারক ও রিফাইনারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ জানিয়েছিলেন. তেল রিফাইনারি ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে সয়াবিন তেলের দাম কমানো হয়েছে। নতুন দাম প্রতি লিটার বোতলজাত তেল ১৬০ টাকা, ৫ লিটার বোতলজাত তেল ৭৬০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই সময় খোলা সয়াবিন ভোক্তাদের হাতে পোঁছাতো ১৬০টাকা লিটারে। বর্তমাতে সরকারে বেধে দেওয়া সেই দামের তোয়াক্কা না কওে অধিক দামে সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে। লাগাম ধরার কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, বোতলজাত ভোজ্যতেলের কোম্পানীগুলো ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে একটি কোম্পানীর বোতলজাত ভোজ্যতেলের সাথে মসলা আইটেম জুড়ে দিয়েছে। শুধু ভোজ্যতেল কেনার সুযোগ নেই। ওই কোম্পানীর তেল কিনতে হলে তাকে বাধ্যতামুলকভাবে মসলা আইটেম কিনতে হবে। আরেকটি কোম্পানীর তেলের সাথে জুড়ে দিয়েছে লবন, সরিষার তেল এবং চা পাতি। অপর একটি বোতলজাত সয়াবিন তেল কোম্পানী তেলের সাথে জুড়ে দিয়েছে মিনিকেট চাউল বা নাজির চাউল এবং চিনি। নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের এসব প্যাকেজ যোগ করে বিক্রি করতে বিপাকে পড়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। এদিকে তেল ক্রেতাদের এসব প্যাকেজ পন্য একসাথে নাও প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভোক্তারা তেল কিনতে এসব প্যাকেজ দেখে বিব্রতিকর অবস্থায় পড়ছেন। ক্রেতাদের মাঝে এসব বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এদিকে সয়াবিন তেলের পাশাপাশি বেড়েছে পামওয়েল ও সুপার পামওয়েলের দাম। সয়াবিনের সাথে পাল্লা দিয়ে পামওয়েল খুচরা বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৭৫ টাকা। সুপার পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮০ টাকা। সয়াবিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় হোটেল ব্যবসায়ীরা পামওয়েল ও সুপার পামওয়েল ব্যবহার করতেন। বর্তমানে এসব ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় হোটেলে বিক্রি ইফতারি ভোজ্য পণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে। বেগুনি, আলুচপসহ প্রত্যেকটি ভোজ্যপন্যেও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে । যেসব হোটেলে এসব পণ্যের দাম বাড়েনি তারা এসব পণ্যে গুণগত মান কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আকৃতিতে ছোট করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সয়াবিনের উপর সরকার ভ্যাট তুলে নেওয়ায় রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এরপরও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের সুবিধা না পৌঁছালে সরকারের রাজস্ব লোকসানের পরও সাধারণ মানুষের কোন উপকারে আসছেনা। এমতবস্থায় নিয়মিত বাজার মনিটরিংসহ ভোজ্যতেলের বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোড়দার করার পরামর্শ দেন তারা। এদিকে সরকারের বেধে দেওয়া ভোজ্যতেল হাতে পাওয়ার দাবি জানান ভোক্তারা।









