বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ--
বাংলার অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিকামী বাঙালির এক অনুপ্রেরক, আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ় উচ্চারণ। এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি দেশপ্রেম, সাহস ও রাজনৈতিক সততায় উজ্জীবিত হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি আজকের এই স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। এদিক থেকে ভাষণটির ঐতিহাসিকতা, আঙ্গিক, শিল্পমূল্য নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতেই জয় লাভ করে। এই নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ, ১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের ঘোষণা দেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’র নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাকিস্তানের সামরিক শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহনা শুরু করে।
১ মার্চ, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও তার মুখপাত্র ঘোষণা দেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পরর্বতী ঘোষণার আগ পর্যন্ত জাতীয় অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান এখন গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।’
এই ঘোষণা শুনে বঙ্গবন্ধু ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন। তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট নয় বরং পাকিস্তানি শাসকরা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি ২ ও ৩ মার্চ সারাদেশে হরতালের ডাক দেন। বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বাত্মকভাবে হরতাল পালন করেন। একদিকে হরতাল, মিছিল অন্যদিকে কারফিউ; সবমিলিয়ে ঢাকা শহর ছিল চরম উত্তপ্ত। অনেক নিরীহ মানুষ হতাহতের শিকার হন।
এরই প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি পুণরায় ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেন। এরপর দিন ছাত্র পরিষদের সঙ্গে সভা শেষে পল্টনে র্যালি করার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু জানান, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তী নির্দেশনা দেবেন। কিন্তু পাকিস্তানি মিলিটারিরা ৭ মার্চের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা না করার জন্য বিভিন্ন রকম বার্তা বঙ্গবন্ধুকে দেয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি মুক্তিকামী বাঙালিদের প্রতিহত করার জন্য তারা রাস্তায় সামরিক ট্যাংক প্রস্তুত রেখেছিলেন। শত বাধা উপেক্ষা করে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাব্যিক সেই ভাষণটি দেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’
১৮ মিনিট স্থায়ী ১১০৮ শব্দের এই ভাষণটি বাঙালির জীবনে সত্যিই এক অবিস্মরণীয় ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এক জীবন্ত রাজনৈতিক মহাকাব্য। বাঙালি জাতির আত্মদর্শন ও আত্মোপলব্ধি। এই ভাষণ বাঙালিদের স্বাধীনতা যুদ্ধে উত্তরণের অন্যতম মূলমন্ত্র। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উচ্চারণ মুক্তিকামী বাঙালির ধমনীতে শিহরণ জাগিয়েছিল। প্রেরণা জুগিয়েছিল দেশমাতৃকার জন্যে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দর্শনের এই ভাষণ কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক বিরাট অর্জন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায় বঙ্গবন্ধু শুধু একটি নাম নয়, একটি জীবন্ত ইতিহাস। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও একটি জাতির রক্তিম সূর্যের আলোকবর্তিকা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির জন্য গৌরবের। ৩০ অক্টোবর সোমবার ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ তালিকায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ তালিকার মাধ্যমে ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে। তখন সত্যিই বাঙালি হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে হয়।
লেখক: বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক









