জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও তাদের এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বাকযুদ্ধ ও রাজনৈতিক তিক্ততা বেড়ে চলেছে। দুই দলই একে অপরের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগের ভাষায়’ কথা বলার অভিযোগ করছে, যা রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি করেছে। সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে, বিশেষ করে উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের সমালোচনামূলক বক্তব্যের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
শনিবার সিলেটে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় রোববার ভার্চুয়াল এক বক্তব্যে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দেন। উভয় দলের নেতাদের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট ও মন্তব্যের ঢেউ দেখা দিয়েছে।
দলগুলোর মধ্যে তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাবনা, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, রাজশাহী ও নরসিংদীসহ কয়েকটি এলাকায় তা সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে। দুই দলের নেতারা একে অপরকে দায়ী করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা যা বলছি তা ইতিহাসভিত্তিক ও সত্যি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। অপর পক্ষ যা বলছে, তার কোনো প্রমাণ বা সত্যতা নেই। এটি শুধু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য করা হচ্ছে।” জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়েরও জানিয়েছেন, বিএনপির দিক থেকে কিছু আক্রমণাত্মক বক্তব্য এসেছে, যা তারা প্রত্যাশা করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দল দুটির এই তিক্ততা ভোটের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, দুই পক্ষই একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে, যা ভোটারদেরও বিরক্ত করছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে মনোযোগ দিচ্ছে, আর জামায়াত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি ইস্যু সামনে নিয়ে আসছে।
শফিকুর রহমান সিলেটে আক্রমণাত্মক বক্তব্যে বলেছেন, এক দল চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের কারণে জনগণের ঘৃণা কুড়িয়েছে। এই বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ইঙ্গিত করেছেন বলে ধারণা করা হয়। এর পর তারেক রহমান লন্ডন থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা বক্তব্যে জামায়াতের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জামায়াত ১৯৭১ সালে স্বার্থ রক্ষার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে, যা সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ভয়ঙ্কর ইতিহাস। তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যক্তি বা দল বিএনপি সম্পর্কে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, যা জামায়াতের কার্যকলাপের সমান্তরাল।
পাশাপাশি, বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা স্থানীয় সমাবেশ ও সভায় একে অপরকে সমালোচনা করে চলেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিভিন্ন সভায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেছেন। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস জামায়াতকে আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে দেখেছেন এবং ধর্ম ব্যবহার করে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
ধারাবাহিক এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সমালোচনার মধ্যেই দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উভয় দলই ভোটের মাঠে সুবিধা নিতে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা সামনে তুলে ধরছে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু ও জনমতের আবেগ কাজে লাগাচ্ছে, আর জামায়াত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব ইস্যু তুলে ধরে তাদের সমর্থক তৈরি করছে।









