কথাসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনা ও রায়হান রাফীর পরিচালনায় ‘প্রেশার কুকার’ একটি নারীবাদী সিনেমা, যেখানে চারজন নারীর নগরকেন্দ্রিক ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও মধ্যবিত্ত সমাজের কঠোর আর্থিক টানাপোড়েনের রূঢ় বাস্তবতার চিত্র অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নগরভিত্তিক কাঠামোর অন্ধকার বা অপ্রকাশিত দিকগুলোসহ নারীর প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা হয়েছে। হাইপারলিংক চলচ্চিত্রের স্টাইলকে ব্যবহার করে বহু বছর ধরে চলমান নারীর সংগ্রামশীলতাকে আধুনিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ভিন্ন চার নারী চরিত্রের লড়াকু চেতনাকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নারীকেন্দ্রিক সিনেমাটিতে দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে নারীদের প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হওয়া মানসিক ও সামাজিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক নগরজীবনের জটিলতা, সামাজিক, পারিবারিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ক্রমবর্ধমান চাপ বোঝাতেই ‘প্রেশার কুকার’ নামটি প্রতীকী অর্থে বেছে নেওয়া হয়েছে।
তেলেগু সিনেমাটি একটি পারিবারিক কমেডি ড্রামা, যা হাস্যরসের ছলে সমাজের ভুল ধারণাগুলোকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মেগা সিটি ঢাকা শহরের কঠোর বাস্তবতাকে রূপক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে ঢালিউডের এই সিরিয়াস থ্রিলার সিনেমায়। তবে গল্প ও চরিত্রের দিক থেকে সিনেমার নাম ‘প্রেশার কুকার’ রাখার ক্ষেত্রে পরিচালক রায়হান রাফী তেলেগু ভাষার ‘প্রেশার কুকার’ মুভি থেকে নিয়েছিলেন কি না, তা বলা মুশকিল।
এদিকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় রায়হান রাফী স্ক্রিপ্টিং, নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ঢঙে এক নতুন স্তরের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পুরো গল্পকেই মেটাফোরিক্যাল বা রূপকধর্মী হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যম ঢাকা শহরকে কেবল একটি লোকেশন হিসেবে নয়; বরং একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। শহরের ট্রাফিক–ব্যবস্থা, মানুষের ভিড়, ঘিঞ্জি লোকালয়, আধুনিক ঢাকার রূপান্তর, নাইট ক্লাব ও নাগরিক যান্ত্রিকতাকে এমনভাবে সংলাপ ও দৃশ্যে আনা হয়েছে, যা প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্ক্রিপ্টে নারীদের কেবল ‘অসহায়’ হিসেবে না দেখিয়ে চরিত্রগুলো নিজস্ব ভঙ্গিতে ধাপে ধাপে বিকশিত হতে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, রায়হান রাফীর সিনেমার সংলাপ সব সময়ই খুব ধারালো এবং বাস্তবসম্মত হয়, যা ‘প্রেশার কুকার’-এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়।
এ সিনেমা শুধু একটি নারীবাদী গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে; বরং এটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। নামকরণ, চিত্রনাট্য, চরিত্রবিন্যাস, ক্যামেরার সূক্ষ্ম ব্যবহার, ভাষার প্রয়োগ ও গল্পের গভীরতার দিক থেকেই চিত্রনাট্যটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মানুষের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছে। অপর দিকে এ সিনেমায় এমন কিছু আনফিল্টারড শব্দ ও সংলাপ রয়েছে, যা ছোটদের জন্য উপযুক্ত নয়। যদিও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক সিনেমাটি ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ ঘোষিত হলেও এখানে বেশ কিছু অশালীন শব্দ বা স্ল্যাং ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও গল্প ও চরিত্রের বাস্তবতা প্রমাণের ক্ষেত্রে যৌন লালসাপূর্ণ সংলাপের তীব্রতা বোঝাতে অনেক সিনেমায় ‘অ্যাডাল্ট ভাষা’র প্রয়োজন হয়।
পরিশেষে রোমান্টিক ও । অ্যাকশনধর্মী সিনেমার জৌলুশ থেকে বেরিয়ে এসে মনস্তাত্ত্বিক ডার্ক গল্পের এই নিরীক্ষা ঢালিউডকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। এদিকে ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রমুখী দর্শকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশ পূরণে প্রতিনিয়ত ব্যতিক্রমী সিনেমা উপহারের চাপে রায়হান রাফীদের ভবিষ্যতেও সত্যিকার অর্থেই প্রেশার কুকারের মধ্যেই পড়তে হবে।









