কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় সাউন্ডবক্স ও মাইকে গান-বাজনা নিষিদ্ধের ঘোষণা ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মাইকিং করে জানানো হয়েছে কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে, এমনকি কবরস্থানে দাফনের সুযোগও দেওয়া হবে না। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামে দিনব্যাপী প্রচার মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেয় স্থানীয় বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটি। সরেজমিনে দেখা যায়, ঘোষণার পর গ্রামজুড়ে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিরা বাড়ি ফিরলেও মসজিদের বারান্দায় চলছিল আলোচনা।
মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী জানান, গত ২৭ মার্চ জুমার নামাজের পর কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহল্লার কোনো বাড়িতে সাউন্ডবক্স বা মাইকসেট বাজানো হলে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে ঈদগাহ, মসজিদ ও কবরস্থানের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হবে। এমনকি সামাজিকভাবে বয়কটও করা হবে।
তার দাবি, কোরআনের আলোকে গান-বাজনা নিষিদ্ধ। সম্প্রতি কিছু বিয়ে ও সুন্নতে খতনা অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স ব্যবহারের কারণে অসুস্থ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। তাই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ কুরবান আলী বলেন, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং অসুস্থ মানুষের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে। এজন্য সম্মিলিতভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট স্থানে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, সম্প্রতি মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে জমারত আলী ও রুপা খাতুনের বাড়িতে তাদের এতিম নাতি আলিফের খতনা অনুষ্ঠানে সাউন্ডবক্স বাজানো হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে আলোচনা করে গ্রামজুড়ে মাইক ও সাউন্ডবক্স ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রুপা খাতুন বলেন, নাতির খুশির জন্য মাত্র একদিন সীমিত শব্দে সাউন্ডবক্স বাজানো হয়েছিল এবং নামাজের সময় তা বন্ধ রাখা হয়। তার অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরেই কিছু মানুষ এই ইস্যুকে বড় করে তুলছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার বড় মাজগ্রামে দেওয়া মাইকিংয়ের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে এভাবে গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। কেউ অতিরিক্ত শব্দ করলে প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে এভাবে সামাজিক বয়কটের ঘোষণা অনুচিত।
কুমারখালীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস এই ঘটনাকে ‘বাড়াবাড়ি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর এ ধরনের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে মসজিদ কমিটির সভাপতি আমির হোসেন দাবি করেন, সব ধরনের গান-বাজনা নিষিদ্ধ নয়; শুধুমাত্র উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কী বলা হয়েছে সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, দেশের আইনে এভাবে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









