সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। মঙ্গলবার এ–সংক্রান্ত এক মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার একটি দলিল’।
অন্যদিকে বিরোধী দল বলেছে, রাষ্ট্রপতিকে এই আদেশ জারির এখতিয়ার দিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। গণভোটের মাধ্যমে যে জনরায় এসেছে, তা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সংসদ সম্মানিত হবে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এই সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা।
কিন্তু বিএনপি ও তার জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন–সংক্রান্ত আলোচনার জন্য সংসদে ২৯ মার্চ মুলতবি প্রস্তাব এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার সংসদে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির আলোচনা শেষে অন্য কার্যক্রম মুলতবি করে প্রস্তাবটির ওপর আলোচনা হয়।
সরকারি দলের ৩ জনসহ মোট ১১ জন সংসদ সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। দুই ঘণ্টার আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বৈধ আইন নয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের আগপর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এমন আদেশ জারি করতে পারতেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপতির এই এখতিয়ার আর নেই।
১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আনা হয়নি। কারণ, এটা না অধ্যাদেশ, না আইন। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন রাখেন—তাহলে রাষ্ট্রপতি কীভাবে, কোন বিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকবেন? যদি সংবিধান সংস্কার হয়ে যেত, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের ফরম থাকত, কে শপথ পড়াবেন নির্ধারিত হতো; তারপর এই শপথের প্রশ্ন আসতে পারত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সংস্কার চায় না, জুলাই সনদ মানে না—এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষর বিএনপি ধারণ করে।
জুলাই আদেশ জারি করাকে এখতিয়ারবহির্ভূত দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি এমন আদেশ জারি করতে পারেন কি না। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “আমি তো পারি না। আমাকে পারাচ্ছে।” রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। এখন সেটা অবৈধ ডিম্ব হয়েছে।’
বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। এটা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরবর্তী সংসদের এখতিয়ার খর্ব করতে পারে, পরবর্তী সংসদকে বাধ্য করতে পারে, এমন কোনো নজির পৃথিবীতে নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কেন গণভোট মানছে না। ঐকমত্য কমিশনে গণভোটের প্রস্তাব তিনিই দিয়েছিলেন। জুলাই সনদে প্রতিটি প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্টে’ (ভিন্নমত) বলা আছে, কোনো দল ইশতেহারে ভিন্নমতের উল্লেখ করে ম্যান্ডেট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। গণভোটের প্রশ্নে নোট অব ডিসেন্টের অংশ কোথায়? ৪টি প্রশ্নের উত্তর ১টি কেন দেওয়া হলো।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর মাধ্যমে সিইসি শপথ ভঙ্গ করেছেন, সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।









