ইসলামের প্রথম আধ্যাত্মিক বাণী “ইকরা” বা “পড়ো” মুসলিম সমাজকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে পরিচালিত করেছে। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার হেরা গুহায় জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে এ বাণী অনুরণিত হয়। এ ঐশী ধ্বনিই মুসলিমদের জ্ঞানার্জন ও বিজ্ঞানচর্চার প্রথম প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। কোরআন ও হাদিসে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্যের উপর বহুবার জোর দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়তম রাসুল (সা.)-কে জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া শেখিয়েছেন এবং রাসুল (সা.) বলেছেন, “ইলম তথা জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।”
রাসুল (সা.) এর প্রেরণায় মুসলিম সমাজের তরুণ ও বৃদ্ধরা জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত হয়েছেন। এক সময়কার মুসলিমরা কেবল ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নয়, বরং জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে সিরিয়ার সুদূর অঞ্চল থেকে আন্দালুস বা স্পেন পর্যন্ত ভ্রমণ করতেন। সাহাবীরা পালাক্রমে রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন এবং একে অপরকে শেখাতেন। আবু হুরায়রা (রা.) পর্যন্ত খেয়ে না খেয়ে মসজিদে নববীতে বসে জ্ঞান আহরণের সুযোগ গ্রহণ করতেন। এর ফলে জাহিলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় একটি জাতিতে পরিণত হয়।
মুসলিমরা কোরআন, হাদিস, সাহিত্য, ভাষাবিজ্ঞান, ফিক্বাহ, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অন্যান্য জাগতিক বিদ্যায় বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন। আবুল কাসেম জাহরাভির অস্ত্রোপচার বিদ্যা, জ্যাবের বিন হায়্যানের রসায়ন, আল-খাওয়ারিজমীর অ্যালজেব্রা, আল-বিরুনীর বিজ্ঞান গবেষণা, ইবনে সিনার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং ফারাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান এসবের কিছু উদাহরণ। মুসলিম মনীষীরা তাদের জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন।
এই জ্ঞানসাধনা শুধুমাত্র মুসলিম সমাজের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না; আরবী গ্রন্থগুলো লাতিন ও ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে ইউরোপের শিক্ষার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাচ্যবিদ কার্লাইল লিখেছেন, “আরবরা মরুচারী বেদুইন হলেও নবীর আবির্ভাবের পর তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় এবং এক শতাব্দীর মধ্যেই সমগ্র বিশ্বের জ্ঞানচর্চায় আলোকিত ভূমিকা পালন করে।” এভাবে মুসলিম মনীষীদের নিরলস বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞান সাধনা বিশ্বসভ্যতার দীপধারার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে।









