আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের কম দামে ফ্ল্যাট বানানোর সুযোগ দিতে সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। দামে ফ্ল্যাট পেলে সাধারণ ক্রেতারা কিনতে আগ্রহী হবেন। এতে আবাসনখাতের স্থবিরতা কেটে যাবে।
- অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় আবাসনখাত বা গৃহনির্মাণশিল্প বেশ কয়েক বছর ধরেই জটিল সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। এর মধ্যেই করোনামহামারির থাবায় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় আবাসন খাতের বিদ্যমান সংকট আরো ঘনীভূত হয়। করোনার কারণে বেশিরভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আবাসনখাতে। এর ওপর দফায় দফায় লকডাউনের কারণে নগর এলাকা ছেড়ে অনেকেই পাড়ি জমায় গ্রামে। এতে নগরায়নে দেখা দেয় স্থবিরতা। যে কারণে আবাসনখাত নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন উদ্যোক্তারা। তবে গেল দুয়েক মাসে করোনার প্রভাব কমে আসায় এ খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে।
আবাসনখাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নেতারা বলছেন, আবাসনখাতকে বাঁচাতে হলে নির্মাণ ব্যয় হ্রাস ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমাতে নির্দিষ্ট মূল্য সংযোজন কর (মূসক) হ্রাস করার প্রয়োজন। তারা আরো বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ জাতীয় ব্যয় হ্রাস করা হলে স্বল্প মূল্যে ক্রেতা সাধারণকে তাদের সামর্থ্যের মধ্যে আবাসন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে আবাসনখাত স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
আবাসানখাতের উদ্যোক্তাদের আয়কর হ্রাসের বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, গৃহায়ন শিল্পের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। অধিকাংশ ডেভেলপাররা অতি উচ্চসুদে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে করোনা সংক্রমণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক আঘাত হানায় তাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়করের উচ্চ হারের কারণে ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছে। এ বিষয়গুলিও সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা হিসাব কষে জানিয়েছেন, আবাসনখাতের সঙ্গে রড, বালি, সিমেন্ট থেকে প্রায় দুশ’র বেশি পশ্চাদসংযোগ শিল্প জড়িত। তাই আবাসনখাত স্থবির হয়ে পড়লে সমগ্র অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবাসনখাতে গতি আনতে এখনই ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন তারা। করোনা পরবর্তী এবারের মেলার মাধ্যমে আবাসনখাতে বিক্রি বাড়বে বলেও আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রায় বছর দুয়েক আগে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে ধস নামে আবাসনখাতে। পুঁজির সবটা বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত থাকলেও করোনাকালে বেচাবিক্রি কমে যায়। মাসে দুই একটি বিক্রি হলেও অধিকাংশই পড়ে থাকে। তবে গেল প্রায় দুই মাস ধরে মহামারির প্রকোপ কমে এলেও আবাসন খাতের বেচা-কেনায় এখনও গতি ফেরেনি। সে কারণেই আবাসান খাতের বেচাকেনা বাড়াতে উদ্যোগ নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। আগামী ২৩ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীতে আসাবন মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।
রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন আনন্দবাজারকে বলেন, দেশে করোনা আঘাত হানার পর থেকেই আবাসানখাতে ধস নামে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। আর্থিক সংকটে পড়ে সাধারণ মানুষ। তবে গেল প্রায় মাস দেড়েক ধরে করোনার প্রকোপ কমে এলেও আর্থিক সংকট কাটেনি। বিক্রির উপযোগী ফ্ল্যাট থাকলেও বিক্রি হয়নি বললেই চলে। এখনই কিনে বসবাস করার মতো অনেক ফ্ল্যাট রেডি থাকলেও ক্রেতা মিলছে না। অথচ এসব ফ্ল্যাট তৈরি করতে গিয়ে পুঁজির বড় অংশ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এখন ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় বিনিয়োগও উঠে আসছে না। ব্যবসায়ী এ নেতা এ ব্যাপারে বলেন, গেল বছরে মূলত করোনার কারণেই আবাসন মেলার আয়োজন করা যায়নি। তবে এখন করোনার প্রকোপ কমে আসায় মেলা হবে। আশা করছি এবারের মেলায় অনেক ক্রেতা আসবেন এবং ফ্ল্যাট কিনবেন।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১২ সালের দিকে আবাসনখাতে ধস নামে। এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে প্রায় চার বছর সময় লেগেছে। করোনা মহামারির কারণে আবাসনখাতে সৃষ্টি হওয়া স্থবিরতা দূর করতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের লোকসান যেন না হয় তা ঠিক রেখে কীভাবে ফ্ল্যাটের দাম কমানো যায় সে ব্যাপারে সরকারকে ভেবে দেখতে হবে বলে পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের কম দামে ফ্ল্যাট বানানোর সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। অর্থনীতির সূত্রানুসারে কম দামে ফ্ল্যাট পেলে সাধারণ ক্রেতারা কিনতে আগ্রহী হবেন। এতে আবাসনখাতের স্থবিরতা কেটে যাবে।
গত কয়েক অর্থবছর থেকে ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাট-প্লট নিবন্ধন ফি ও কর কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়ে এলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ণের আগে রিহ্যাব থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন জানিয়ে গেইন ট্যাক্স ২ শতাংশ, স্ট্যাম্প ফি ১ দশমিক ৫ শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ১ শতাংশ, মূসক ১.৫ শতাংশ এভাবে মোট ৭ শতাংশ নির্ধারণে জোরালো দাবি জানানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার কর ২ থেকে ১.৫ শতাংশ এবং স্ট্যাম্প ফি ৩ থেকে ১.৫ শতাংশ কমানো হয়। এতে ফি ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ১২ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে।
সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের নিবন্ধন ব্যয় ৪ থেকে ৭ শতাংশ এর বেশি না। আবাসন ব্যবসায়ীরা গৃহায়ণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের আয়কর হ্রাস এবং অর্থ পাচার রোধে কোনো শর্ত ছাড়া আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অথৈ ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান শামীমুর রহমান বলেন, করোনা মহামারির সময়ে আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা যেহেতু ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছে না, সেজন্য তাদের টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ, সুদের হার কমানো বা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সময় বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় যেসব ক্রেতা কিস্তিতে ফ্ল্যাট কিনেছিল তারাও এখন আর কিস্তি দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে তহবিল প্রদানের মাধ্যমে আবাসন খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেন ব্যবসায়ীরা। আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে এই খাতকে আরো গতিশীল এবং সত্যিকার অর্থে স্বল্প আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার স্বপ্নকে সার্থক করতে ক্রেতা সাধারণের জন্য অন্তত একটি ফ্ল্যাট কিনতে সহজ শর্তে সর্বোচ্চ একক অংকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের টাকা কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করার দাবি করেন অনেকে। এক্ষেত্রে হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশনকে সরকার একটি তহবিল প্রদান করে স্বল্প সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ সরবরাহ করতে পারে বলেও মতামত দেন আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা।
করোনাকালিন সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আবাসনখাতের ক্রেতা, জমির মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অসমাপ্ত প্রকল্পগুলোতে বিশেষ ঋণের প্রচলন করা, সাপ্লায়ার ভ্যাট ও উৎস কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে ৫ বৎসরের জন্য ডেভেলপারদের অব্যহতি দেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন। ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে ৫ বৎসরের জন্য এবং পৌরসভার বাইরের এলাকাতে নগরায়নকে উৎসাহিত করতে ১০ বৎসরের জন্য ‘ট্র্যাক্স হলিডে’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা অনেকে বলেছেন। নামমাত্র নিবন্ধন ব্যয় নির্ধারণ করে আবাসন খাতে ‘সেকেন্ডারি বাজার’ ব্যবস্থার প্রচলন করা প্রয়োজন বলেও আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।
রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন আরো বলেন, গত কয়েক বছর থেকে ফ্ল্যাট এবং জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিমাত্রার নিবন্ধন ব্যয় ধার্য আছে। আমরা এ ফি কমানোর দাবি করলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। নিবন্ধন ফি বেশি থাকায় পুরানো ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে পুনরায় নতুন ফ্ল্যাটের সমান নিবন্ধন ব্যয় করতে হয়, যা অযৌক্তিক। করোনার কারণে আবাসনখাতের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে নিবন্ধন ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি।
আনন্দবাজার/শহক









