- নির্বিচারে কাটা হচ্ছে উর্বর মাটি
- ঝুঁকিতে বাঁধ, হুমকিতে কুমিল্লা শহর
গোমতী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা ও বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে: মোহাম্মদ শওকত ওসমান, উপ-পরিচালক, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কুমিল্লা
কুমিল্লা জেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা গোমতী নদী। নদীর তীর ঘেঁষেই কুমিল্লা শহর। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ডুমুর নামক স্থান থেকে উৎপন্ন নদীটি কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর হয়ে দাউদকান্দির শাপটা এলাকায় গোমতী মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। গোমতীর দুই তীরের মাটি বেশ উর্বর। এখানে প্রচুর পরিমাণ সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়। দুই তীরে নয়নাভিরাম বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ।
গোমতী নদীর অববাহিকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের কাছে দিনদিন আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়ে উঠছে নদীর দুই তীর। সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিকেল হলেই সব বয়সী মানুষের ভিড় বাড়ে। ছুটির দিনগুলোতে কুমিল্লা শহরের টিক্কারচর এলাকায় নদীর উপর নির্মেত ব্রিজটিকে ঘিরে প্রতিদিন বিকেলে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। পালপাড়া, বানাশুয়া, রত্নাবতী, চাঁনপুর এলাকা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে। তবে এতোকিছু ইতিবাচক দিকগুলোকে চাপিয়ে দিন শেষে গোমতী নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কিছু হতাশার গল্প। এ নদীকে ঘিরে জমে উঠা বালি ও মাটির অবৈধ বাণিজ্য ধ্বংস করছে সবকিছু।
এ জেলার হাজার হাজার একর ফসলী জমির সেচের চাহিদা মিটে গোমতীর জলে। শুষ্ক মৌসুমে শান্ত গোমতী বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করে। বর্ষায় নদীর পানি প্রবাহ ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত উঠা নামা করে। একটা সময় ছিলো বর্ষাকালে গোমতী হয়ে উঠতো কুমিল্লার দুঃখ। গোমতীর প্রবল স্রোতে তলিয়ে যেতো বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলী মাঠ। বন্যা এবং প্রবল স্রোতের কবল থেকে বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষায় নদীটির দু’ধারে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার এলাকায় ঊঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
এ নদীকে ঘিরে জমে উঠেছে বালি ও মাটির অবৈধ বাণিজ্য। নদীর চর থেকে নির্বিচারে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু চক্র। নদীপাড়ের অধিবাসীদের অভিযোগ- প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে একশ্রেণির অসাধু লোকজন অবৈধভাবে মাটি কেটে শহর রক্ষা বাঁধকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে দিনদিন। এভাবে মাটি উত্তোলন, বাঁধের উপর দিয়ে মাটিবোঝাই ট্রাক্টর চলাচলের দরুণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে গোমতীর দুই ধারে শহর রক্ষা বাঁধ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কুমিল্লার বুড়িচং, সদর, দেবীদ্বার, মুরাদনগর প্রভৃতি উপজেলার গোমতী নদীর দু’তীরের ৮৩ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ৬০ কিলোমিটারই ক্ষমতাসীনদের দখলে। ক্ষমতাসীন কিছু লোক প্রভাব খাটিয়ে নদীর চর এলাকা ও আশপাশ দিয়ে অবৈধভাবে ট্রাক্টরে মাটি ও বালি বহন করে ইটভাটা, বিভিন্ন বাসাবাড়ি, পুকুর ভরাটসহ নানা স্থানে সরবরাহ করে থাকে। এই কাজে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ২ শতাধিক ট্রাক্টর।
কুমিল্লা নগরীর পালপাড়া, বাবুর বাজার, কামাড়খাড়া, বালিখাড়া, পূর্বহুড়া, রামনগর, নানুয়ার বাজার, মিথিলাপুর, শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, শ্যামপুর, মালাপাড়া, মনোহরপুর, কংশনগর বাজার, রামচন্দ্রপুর, পারুয়ারা, এতবারপুর, কাঁঠালিয়া, মীরপুরসহ চিহ্নিত আরও বেশকিছু স্থান দিয়ে গোমতী নদীর মাটি কাটা হয়। গোবিন্দপুর গ্রামের জাহের, শিবরামপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম, টিটু, ইউসুফসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেকেই জানান, গোমতী নদীর চর থেকে মাটি ও বালি উত্তোলন করে গড়ে দিনে-রাতে প্রায় ২ শতাধিক ট্রাক্টর চলাচল করছে।
এদিকে অব্যাহত মাটি কাটার ফলে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ময়নামতি এলাকাসহ চিহ্নিত ৩০-৪০টি পয়েন্ট দিয়ে বর্ষা মৌসুমে হুমকির মুখে পড়বে বলে এলাকাবাসী জানান। এসব এলাকায় যে কোনো সময় ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। নদীর দুই তীরে নয়নাভিরাম বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ দিন দিন বিলীন হচ্ছে, মাটি খেকোদের কারনে। নদী তীরে নানান প্রজাতির ফলদ-বজন গাছপালাসহ ফসলী জমি ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে।
নদী তীরের কৃষক রবিউল, কায়দে আজম, হায়দর আলী, আবু তাহেরসহ অন্তত ২০/২৫ জন কৃষক জানান, ড্রেজার দিয়ে নদীর চর থেকে মাটি কাটার কারণে আমাদের প্রায় ১০০ শতক ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। আমরা সাধারণ কৃষক।
এদিকে ২০২০ সালে গোমতী নদী দিয়ে কুমিল্লা হয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে নৌপথে ভারতের ত্রিপুরায় পন্য রপ্তানির উদ্যোগ নেয় দু’দেশের সরকার।
২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোমতী নদী ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে সিমেন্টবাহী একটি ভেসেল পাঠানোর মধ্য দিয়ে নৌ-পথে বাংলাদেশ-ভারত আমদানি রপ্তানির দ্বার উন্মোচন হয়। তবে, নদীর নব্যতা সংকটের ফলে সেদিন নৌযানটি পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছিলো। নদীটির কুমিল্লা অংশে বেশ কয়েকটি স্থানে ডুবো চরে আটকে যায় সিমেন্টবাহী ছোট্ট নৌযানটি। সে সময় পরীক্ষামুলক এই সিমেন্টবাহী ভেসেলটির যাত্রার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নদীটিকে খননের উপর জোর দেন বিআইডব্লিউটিএ-এর ততকালীন চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক।
স্থানীয়রা জানান, জেলার চারটি উপজেলায় গোমতী নদীর বাঁধের অভ্যন্তরে অন্তত ৪০টি পয়েন্টে নির্বিচারে মাটি কাটা হয়। প্রকাশ্যে নদীর মাটি লুটে নিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র। অবাধে এসব এলাকায় মাটি কাটার ফলে নষ্ট হচ্ছে বাঁধের ভেতরের উর্বর ফসলী জমি।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, অবৈধভাবে গোমতির মাটি কাটার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। নদীর সুরক্ষায় অবিলম্বে, দখল-দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। এ ব্যাপারে শক্ত একটি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কৃষি ও পরিবেশ আন্দোলন সংগঠক অধ্যাপক মতিন সৈকত বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
এব্যাপারে কুমিল্লার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শওকত ওসমান জানান, গোমতী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা ও বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বালি উত্তোলনের ইজার প্রদান বন্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। ভারতের সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য চালুর ক্ষেত্রে নদীর নব্যতার বিষয়ে জেলা প্রশাসন নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের অভিযানেও থামছে না অবৈধভাবে মাটি কাটার মহাউৎসব।









