বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে ব্যাপকহারে শহরায়ণ ঘটছে। প্রান্তিক বা পল্লী এলাকা থেকে কাজের সন্ধানে নগরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ স্রোতের মতো ধেয়ে এসেছে, আসছে। বর্তমানে দেশের রাজধানীসহ মেগাসিটিগুলো জনবিস্ফোরণে কাঁপছে। এমন পরিস্থিতিতে শহর আর গ্রামাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। ক্রমসম্প্রসারণশীল অর্থনীতির সুযোগে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থারও আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। যেকোনো সিটি থেকে অতি সহজেই জেলা বা মফস্বল শহর কিংবা গ্রামে যাতায়াত করা যাচ্ছে। এমনকি সড়ক আর রেলপথের পাশাপাশি আকাশপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণ হয়েছে। উন্নত বিশ্বের আদলে নির্মাণ করা হচ্ছে মহাসড়কগুলো।
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন চোখ ধাঁধানো উন্নতির মধ্যে শুধু একটিমাত্র দৃশ্যের কোনো বদল বা আধুনিকায়ন ঘটেনি। ঘটানো যে প্রয়োজন তা নিয়ে ভাবনাগুলোও একেবারে আদিম। গত কয়েক দশক ধরে চিরচেনা সেই মুখস্থ দৃশ্যের দেখা মেলে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ দুটি উৎসব ঘিরে। নগরগুলো, বিশেষত রাজধানী থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে যায় গ্রামে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে। যে প্রবণতাকে দেশীয় সংস্কৃতিতে শেকড়ের কিংবা নাড়ির টান বলা হচ্ছে। তবে নাড়ির টানে গ্রামে ফেরার সেই অভূতপূর্ব ভোগান্তির দৃশ্য মঞ্চায়ন হয়ে আসছে প্রতিটি ঈদের দুই সপ্তাহ কাল ব্যাপী।
অবশ্য একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ঘরে ফেরা বিশ্বের আর কোনো দেশে আছে কিনা জানা না থাকলেও একটা জিনিস সবার জানা- সেটা হলো ভোগান্তি। যে ভোগান্তি এখন ‘উৎসবে’ রূপ নিয়েছে। যদিও দূরপাল্লার বাস কিংবা ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে কাউন্টারগুলোতে হামলে পড়ার যে দৃশ্য, তা বিশ্বে বিরল। টিভিতে লাইভ দেখানো হয় সেই ভোগান্তি উৎসবের। পত্রিকায় বড় বড় হেডলাইন করা হয়। আর অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সেসব ভোগান্তির।
টিকিট সংগ্রহ করার জন্য রাজধানীর ব্যস্ত মানুষ আগের দিন থেকে অপেক্ষা করেন কাউন্টারগুলোতে। কেউ খাবার-দাবার হাতে করে নিয়ে যান। সারারাত ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন একটি মাত্র টিকিটের আশায়। কেউ ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন কিংবা শুয়ে পড়েন। কেউ আবার ঘুমিয়েও পড়েন।
গ্রামে থাকা প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দের ভাগভাগা করতে যে পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা যে সেই আনন্দের কাছে তুচ্ছ তা মানতে নারাজ অনেকেই। রাতভর কিংবা ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ করে যে টিকিট সংগ্রহ করছেন তাতে বিশ্ববিজয়ের হাসিতে ভাসছেন টিকিট বিজয়ীরা। সেই হাসিতে টিকিট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের চাপ আর থাকে না কর্তৃপক্ষের ওপর। কর্তৃপক্ষ কিংবা রেল বা বাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা টিকিট বিজয়ীদের এই উল্লাস দেখে চরম খুশি হন। পরবর্তী ঈদেও যেন তারা এমন উল্লাস দেখতে পারেন সে ব্যাপারে মুখিয়ে থাকেন বছর জুড়ে। ভোগান্তির উৎসবরূপ দেখে এমনটাই মনে করছেন টিকিট প্রত্যাশীরা।
আর সে কারণেই গত কয়েক দশক ধরে যে দেশের সড়কগুলো উন্নত বিশ্বের আদলে মহাসড়ক কিংবা এক্সপ্রেসওয়েতে বদলে গেছে, উন্নত মডেলের বিশ্বখ্যাত বাস কিংবা পরিবহনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে তার সুফল পাওয়া নিয়ে তেমন তোড়জোর দেখা যায় না। ভোগান্তি যখন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার বদলে উৎসবে রূপ নেয় তখন এমন ঘটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন অনেকে। ভোগান্তিতে ভুগতে ভুগতে চিরচেনা ভোগান্তিই এখন হয়ে ওঠেছে বড় আনন্দের, উৎসবের অনুসঙ্গ। ভোগান্তির মধ্যেই মহাতৃপ্তি আর মহান আনন্দ খুঁজে ফিরছেন যাত্রী থেকে শুরু করে পরিবহন কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারের যোগাযোগ বিভাগ।
গণমাধ্যম যখন ভোগান্তির দৃশ্য দেখিয়ে অগণিত পাঠক কিংবা অডিয়েন্সকে বিস্মিত কিংবা মুগ্ধ করছে, ঈদের খুশির সঙ্গে ভোগান্তি একাকার করে ফেলছে তখন বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছেন তা নিয়ে কৌতুহল থাকতেই পারে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বললে তারা যে বক্তব্য দিলেন তাতে উদ্বেগের কিছু নেই। তারা বলছেন, ভোগান্তি যে শুধু কয়েক বছর ধরে হচ্ছে, বিষয়টা এমন না। ভোগান্তি চলে আসছে বিগত কয়েক দশক ধরেই। কোনোভাবেই ভোগান্তি কমছে না। বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, ভোগান্তি যখন ভাগ্যের কিংবা কপালের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়, তখন কমবে কীভাবে?
সচেতন যাত্রীরা বলছেন, ঈদে আমজনতার যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় সাশ্রয়ী পরিবহন ট্রেন। যা নিরাপদ আর আরামদায়ক হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে সেই খ্যাতির পেছনে যে ‘কুখ্যাত’ ভোগান্তি তার গল্পগুলো গত কয়েক দশক ধরে সয়ে সয়ে সহনীয় যেমন হয়েছে তেমনি ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে এই ভোগান্তিকে কনভার্ট করে উপভোগ হিসেবে নিয়েছে আমজনতা। অবশ্য ট্রেন কর্তৃপক্ষ আমজনতার ভোগান্তির উৎসবে বৈচিত্র আনতে (পড়ুন কালোবাজি রোধে) এর আগে অফলাইন থেকে টিকিট নিয়ে যায় অনলাইনে। তবে সেখানেও যে লাউ, সেই কদু! ভোগান্তিউৎসবে বাড়তি বৈচিত্রের রং ধরেনি। অনলাইন টিকেটের ক্ষেত্রে শর্ষের মধ্যে ভূতের প্রবেশ ঘটে। টিকিট বেচার দায়িত্বরতরাই কালোবাজারির মতো ভোগান্তির বৈচিত্র উপহার দিতে লাগলেন।
তবে এবার ভোগান্তি উৎসবে দেখা গেছে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। প্রতিবছর ঈদ এলে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইনে শুধু পুরুষদেরই চোখে পড়তো। তবে এবারই প্রথম নারীদের জন্য আলাদা টিকিট বুথ কিংবা কাউন্টার খোলা হয়। আর সেক্ষেত্রে এবার আরেক ইতিহাস তৈরি হয়েছে। শুধু স্বামী, ভাই, বাবারাই কেন টিকিট কাটতে গিয়ে দিনরাতের উৎসবে মিলিত হবেন? ভারসাম্য রক্ষায় তাই এবার নারীরা এলেন টিকিট কাউন্টারে। হয়তো বাবা, ভাই কিংবা স্বামী গেছেন পুরুষের লাইনে আর তিনি নিজে দাঁড়িয়েছেন নারীদের কাউন্টারের লাইনে। টিকিটের জন্য অপেক্ষা তো সারারাতের কিংবা ২৪ ঘণ্টা অথবা ৪৮ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টাতে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বাচ্চাকাচ্চা কিংবা অন্য সদস্যের ঘরে একা রেখে আসার কী দরকার? সবাইকে নিয়ে এলেই তো পারিবারিক একটা আবহ তৈরি হতে পারে।
রাজধানীর কমলাপুরে ট্রেনের টিকিট কাউন্টারের সামনের দৃশ্য এবার পারিবারিক পর্যায়েই চলে গেছে। টিকিট কাটতে অনেক নারী কোলের বাচ্চা নিয়ে এসেছেন। তবে বিপদ হলো কর্তৃপক্ষ টিকিটের ব্যবস্থা করলেও অপেক্ষমাণ টিকিট প্রত্যাশীদের রাতভর অপেক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা করে রাখেনি। অবশ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শের জন্য বসে থাকেননি টিকিট প্রত্যাশীরা। সচেতন অনেকেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন বসার চেয়ার, মোড়া। কেউ আবার রাতযাপনের বিষয় মাথায় রেখেই নিয়ে এসেছেন কাঁথা-বালিশ। লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যারা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন তখন কাঁথা বিছিয়ে বালিশটা মাথার নিচে দিয়ে স্টেশন চত্বরে শুয়ে পড়ছেন তারা।
ট্রেন ভোগান্তিউৎসবে অংশ নেয়া যাত্রীদের অনেকের দাবি, টিকিটের জন্য যারা একদিন আগে লাইনে দাঁড়ান, তাদের জন্য সরকারের কিছু করা উচিত। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য স্তন্যপান করাতে আরও বেশি ‘ফিডিংকর্নার করা দরকার। বিশ্রাম কক্ষ আরও বাড়ানো দরকার। তবে অনেক যাত্রী আরও অনেক সম্ভাবনার দিক তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, অপেক্ষামাণ টিকিটপ্রত্যাশীদের জন্য থাকা আর খাওয়ার ব্যবস্থা সুন্দরভাবে করা যেতে পারে। যে ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা স্বল্পকালীন বিনিয়োগও করতে পারেন। ভ্রাম্যমাণ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা যেতে পারে। আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে রুম বুকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। এতে টিকিট প্রত্যাশিদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। তারা ভ্রাম্যমাণ আবাসিকে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবেন টিকিট প্রত্যাশীরা। এক্ষেত্রে রেলের রাজস্ব বাড়তে পারে।
ভোগান্তি নিরসন না করতে করতে আমজনতা এখন সেই ভোগান্তিতেই স্বস্তি পাচ্ছেন। আর এই স্বস্তি আর উৎসবমুখরতা ঘিরে ছোট ছোট উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। তারা বলছেন, রেল স্টেশন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ খাবার হোটেল করা যেতে পারে। যেখানে রাতদিন ধরে টিকিটের জন্য অপেক্ষার ফাঁকে খাওয়া দাওয়াসহ প্রয়োজনীয় দরকারি কাজ সারতে পারবেন। হোটেল স্থাপন করলেও অন্যদিকে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দুই ঈদের পনের দিন করে এক মাস ব্যবসার বড় একটা সুযোগ থাকবে। যেখান থেকে সারাবছরের আয় তুলে আনা সম্ভব। শুধু তাই নয়, টিকিট প্রত্যাশীদের ছোটখাট কেনাকাটার জন্য মুদি দোকানও দেয়া যেতে পারে স্টেশন এলাকায়। এমনটাই মনে করছেন অনেক টিকিট প্রত্যাশী।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে রয়েছে উন্নত ট্রেন। সেখানে সেবাও উন্নতমানের। মুহূর্তেই পাওয়া যায় টিকিট। সময়মতো চলে যাওয়া যায় গন্তব্যে। সেসব দেশে অন্যান্য পরিবহনের চেয়ে ট্রেন ভ্রমণ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ আর আরামদায়ক। সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ট্রেনকে আধুনিকায়ন করতে চেষ্টা করছেন। এনিয়ে ব্যাপক বিনিয়োগও করা হচ্ছে। তবে টিকিট ভোগান্তির অবসান ঘটছেই না। অথচ সরকারের সবচেয়ে বড় ও লাভজনকখাত হিসেবে রেলের বিকাশ হতে পারে।
টিকিট প্রত্যাশীদের অনেকেই মনে করছেন, টিকিট পেতে ভোগান্তি কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। দেশে তরুণ অনেক গবেষক আছেন তাদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। ঈদ উৎসব ঘিরে টিকিট ভোগান্তির সহজ সমাধান করতে যারা গবেষণা চালাবেন। প্রয়োজনে রেলের খরচে তাদের উন্নত রেলসেবার দেশে পাঠানো যায়।
জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরামদায়ক পরিবহন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে ট্রেন। অথচ আমাদের দেশে ভোগান্তির আরেক নাম ট্রেন। অথচ সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে এ খাতে। আসলে ভোগান্তি যখন ভাগ্যের কিংবা কপালের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়, তখন কমবে কীভাবে? তিনি আরও বলেন, বিশাল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, রেললাইন আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, স্টেশনের উন্নয়ন হচ্ছে, নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে। কিন্তু ভোগান্তি কমাতে কোনো নজর নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করেও যাত্রী ভোগান্তি কমছে না। দেশ ডিজিটাল হয়েছে অথচ টিকেট কাটার সিস্টেম এনালগ।
আনন্দবাজার/শহক









