জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুধু পৃথিবীর পরিবেশ-প্রতিবেশই ঝুঁকিতে নেই, আবহমান নদ-নদীর জন্যও বড় বিপদ নিয়ে আসছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ভূ-পৃষ্ঠের উপরিতলের পানির উৎসগুলিকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমনি হিমবাহের বরফ গলে নদীতে ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনছে। যা জনপদকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে আবার চাষাবাদ আর দৈনন্দিন জীবনযাপনে ভূগর্ভের পানি অত্যধিক উত্তোলনের ফলে নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উপমহাদেশের গঙ্গা-সিন্ধুর মতো নদীগুলোর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যা সভ্যতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। মানচিত্রহীন নদ-নদীর বিপদ নিয়ে ফারুক আহমাদ আরিফের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব- ‘উষ্ণায়নের থাবায় নদ-নদী’।
আবারো সিনেমার পর্দায় নিয়ে যেতে চাই আপনাদের। নিশ্চয় মনে আছে ভারতের ৫০তম স্বাধীনতা বর্ষপূর্তিতে ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শাহরুখ খান ও মাহিমা চৌধুরী অভিনীত ‘পরদেশ’ ছবিটির কথা? চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে দেখানো হয় গঙ্গার প্রবাহমান স্রোতকে। যেখানে গঙ্গাকে তার চিরাচরিত স্রোতে ছেড়ে দেয়া হয়। যে কথাগুলোতে শেষ সব সমস্যার তা হচ্ছে গঙ্গার দাদীর ‘এ জিস সাগর কি গঙ্গা, উস সাগর মে যায়। যা সুর সাঙ্গম না তাল মিলে, উস পরদেশ ভালা কিউ যায়ে?’ অর্থাৎ নদীর যেখানে মিলিত হওয়ার কথা সেখানেই মিলাতে হয়। অন্য কোথাও মিলালে তা ছন্দ হারায়।
চলচ্চিত্রটি নদীর চিরাচরিত রূপকে নিজস্ব গতিপথে ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানায়। গত ২৫ আগস্ট দৈনিক আনন্দবাজারে ‘বাঁধনহারা নদীর স্বপ্ন’ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বুলাতে পারেন চোখ। যাই হোক গঙ্গাকে নিয়ে অশনি সংকেত উচ্চারণ করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংগঠন- ওয়ার্ল্ড মেথোডোলজি অর্গানাইজেশন-ডব্লিউএমও।
গত ২৯ নভেম্বর ডব্লিউএমও’র মহাসচিব অধ্যাপক পেটারি তালাস ও হাইড্রোলজি পরিচালক ড. স্টেফেন উলেনব্রক জেনেভায় সদর দপ্তরে ‘স্টেট অফ গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্স ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নাসার গ্রেস মিশন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি প্রতিবেদরটিতে দেওয়া হয়েছে বিশ্বের সব দেশের জন্য করণীয় বিষয়ে পরামর্শও।
সেই পরামর্শে বলা হয়েছে, ২০০২ হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই দশকে গঙ্গার পানিপ্রবাহ ব্যাপক হারে কমেছে। শুধু নদীতে কমেছে বিষয়টি এমন নয় বরং গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিও কমেছে। এই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে সিন্ধু নদের অববাহিকা, দক্ষিণ আমেরিকার পাটাগনিয়ার সাও ফ্রানসিসকো নদীর অববাহিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকা। উল্টো চিত্র দেখা গেছে নাইজার নদী অববাহিকা এবং উত্তর আমাজন নদী অববাহিকায়। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ বেড়েছে।
ডব্লিউএমও’র প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর উপরিভাগের ব্যবহারযোগ্য পানির উৎসগুলিকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ব উষ্ণায়নে হিমবাহের বরফ গলে নদীতে জলের পরিমাণ বাড়ালেও এক সময় তা হ্রাস পায়। হিমবাহ গলনের প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে সিন্ধু এবং গঙ্গানদীর অববাহিকা অঞ্চলগুলোতে। প্রভাবিত হবে উত্তরাখণ্ডের মতো এলাকাও। নিচের দিকে এলাকা অর্থাৎ পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে চাষবাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য অত্যাধিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে তার পরিমাণও কমছে দ্রুত।
মাটিতে কত পরিমাণ পানি সঞ্চিত আছে তার ওপর ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ডব্লিউএমও। তাতে বলা হয়, মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ, ভূগর্ভস্থ পানি, বরফ, গাছপালায় সঞ্চিত পানি, নদী ও হ্রদের পানির পরিমাণ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাটাগনিয়া, উত্তর আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্য ভাগ, পাকিস্তান এবং উত্তর ভারতে সঞ্চিত পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে কম। কোথাও স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই কম।
আফ্রিকার কেন্দ্রীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ বিশেষত আমাজন অববাহিকা এবং চীনের উত্তরাংশে সঞ্চিত পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি। বেশির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের গলনের কথা। অন্যদিকে যেসব অঞ্চলে মাটিতে সঞ্চিত পানির পরিমাণ কম রয়েছে তার মূল কারণ নদী এবং ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার।
ডব্লিউএমও জানায়, লা নিনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২১ সালে বিশ্বের অনেক জায়গাতেই স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। লা নিনায় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপরি ভাগের তাপমাত্রা হ্রাস পায়। আবার ক্রান্তীয় জলবায়ুতে পরিবর্তন ঘটায়। এতে বৃষ্টিপাতের তারতম্য ঘটে। কোথাও কমে যায় ও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়।
লা নিনাতেই ভারতের মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০২১-এ বিশ্বে চার শতাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। যার মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। প্রাণ গেছে প্রায় ১০ হাজার। প্রভাবিত করেছে বিশ্বের ১০ কোটি জনবসতিকে।
গেল বছর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে এক ডিগ্রিরও বেশি। বছরটিকে চিহ্নিত করা হয় ইতিহাসের সপ্তম উষ্ণতম বর্ষ হিসেবে। লা নিনার বিপরীত হলো এল নিনো। এতে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপরের ভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। স্বাভাবিকের থেকে বৃষ্টিপাত কম হয়। বন্যা এবং খরার প্রাদুর্ভাবও বেশি হয়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং শীতও চলে লম্বা সময় ধরে।
গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদীও বটে। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৭০৪ কিলোমিটার, মাইল হিসেবে যা এক হাজার ৬৮০; উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে। দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এক্ষেত্রে এর দুটি ধারা বা শাখা লক্ষনীয়- একটি ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। অপরটি বাংলাদেশ সীমান্তে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে।
জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি। গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব প্রতিবর্গ মাইলে এক হাজার। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা। আবার বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর একটিও গঙ্গা।
আনন্দবাজার/শহক









