বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর মিলে নৌপথকে রাজস্ব আদায়ের ব্যাংক বানিয়ে ফেলেছে। এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। দৈনিক আনন্দবাজারের প্রতিবেদক নাঈম কামালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, রাজস্ব আদায়ে তারা এতোটাই মনোযোগী যে এ খাতে তদারকির সামান্যতম সময়ও পায় না। যদিও তাদের প্রধানতম কাজই হচ্ছে নৌপথকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত তদারকি করা। প্রতিবছর এখাতে জনবল নিয়োগ হচ্ছে, বছর বছর তাদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু বরাবরই তারা উদাসীন। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে যেন তাদের কোনো চিন্তাই নেই। যাত্রীদের কল্যাণে কখনোই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাইনি তাদের।
গণমাধ্যমে আড়াল হলেই বিআইডব্লিউটিএ ঘুমিয়ে পড়ে এমনটা জানিয়ে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যতদিন পর্যন্ত গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, ততদিন তারা কিছুটা হলেও কাজ করে আর যখনই গণমাধ্যমের আড়াল চলে যায়, তখন থেকেই তারা পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাসগুলো বছর বছর ফিটনেস পরীক্ষা করে সড়কে নামে। প্রতিদিন ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার আগে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র নিতে হয়। যাত্রী সংখ্যা, ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা আছে কিনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা- এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে চলাচলের অনুমতি দিয়ে থাকে বিআইডব্লিউটিএ। তারপরও কীভাবে এত ত্রুটি নিয়ে রাজধানী থেকে এসব নৌযান ছেড়ে যায় এবং রাজধানীতে প্রবেশ করে?
এমভি অভিযান-১০- এর দুর্ঘটনা বিষয়ে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, যাত্রীদের অভিযোগ ছিলো ইঞ্জিনের ত্রুটি নিয়েই রাজধানী থেকে লঞ্চটি ছেড়ে গিয়েছিলো। কর্তৃপক্ষকে বলার পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারণে এতবড় একটি ঘটনা ঘটলো। বাসের মতো লঞ্চেও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন, বডি নিয়ে অসংখ্য লঞ্চ চলছে এবং যাত্রীদের জীবন নিয়ে খেলছে। বছর বছর লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হলেও যাত্রী সেবা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা এখনো সেকেলে রয়ে গেছে।
মোজাম্মেল হক আরো বলেন, যাচাই-বাছাই করে ছাড়পত্র দেয়ার কথা থাকলেও এসি রুমে বসেই তারা ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করেন। কখনোই দেখেন না যে লঞ্চের ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করছেন তা কি আসলেই চলার উপযোগী কিনা। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয়েছে কিনা তাও জানেন না। এ বিষয়টি একাধিকবার গণমাধ্যমে উঠে আসলেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো খোঁজ নিলে দেখা যাবে অধিকাংশ পরিবহনে পর্যাপ্ত বয় নেই, স্টাফ নেই, নিরাপত্তাকর্মী নেই। এসব বিবেচনায় কোনো লঞ্চই ছাড়পত্র পাওয়ার উপযুক্ত নয়। কিন্তু প্রতিদিনই লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহন করছে তারা। সরজমিনে গিয়ে যদি ছাড়পত্র দেয়া হতো তাহলে এমন দুর্ঘটনা ঘটার কোনো আশঙ্কাই তৈরি হতো না। লক্কড়-ঝক্কড় ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চকে সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট দেওয়ার কারণে এবং হতাহতের দায়ে বিআইডাব্লিউটিএ এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার দাবি জানান তিনি।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে জানিয়ে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আইন করার চেয়ে বাস্তবায়ন করা অধিক জরুরি। এ পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশের তদন্ত কমিটি দোষীদের বাঁচানোর পথ তৈরি করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। হাতে গোনা কয়েকটিতে দোষীদের শাস্তির সুপারিশ করা হলেও সেগুলো ডিপ ফ্রিজে রেখে দেয়া হয়েছে। পিনাক-৬ লঞ্চের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন সেই দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জড়িত কর্মকর্তাকে শুধুমাত্র বদলি করা হয়েছে। বদলি কখনও শাস্তি হতে পারে না। ঠিক কতজন নিখোঁজ রয়েছেন তারও কোনো তালিকা নেই কারও কাছে। সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না।
যাত্রীদের বিষয়ে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যাত্রীরা মালিক-শ্রমিকদের কাছে অনেকটাই জিম্মি। বাধ্য হয়েই নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের। এ খাতকে নিরাপদ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও আমাদের দেশে কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। যার বলি হচ্ছেন নিরীহ যাত্রীরা। এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
আনন্দবাজার/শহক









