বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। এ সম্পর্ককে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টিকে ভিত্তি ধরে অর্থনৈতিক কূটনীতি বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে দৈনিক আনন্দবাজার। আজ বাংলাদেশ-ভুটানের পর্যটন সম্পর্ক নিয়ে ‘পর্যটনে হিমালয়ের হাতছানি শিরোনামে তৃতীয় প্রতিবেদন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভুটানে ভ্রমণে যান। আবার ভুটান থেকেও কিছু পর্যটক বাংলাদেশে আসেন। দেশ দুটির মধ্যে বেশকিছু ঐতিহাসিক দিক বিদ্যমান। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মালম্বী ভুটানে যেমন প্যাগোডা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে আছে প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। আছে সংস্কৃতির ঐতিহ্য। উভয় দেশের মধ্যে পর্যটনশিল্পের বিকাশে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা আটকে আছে বছরের পর বছর।
সূত্রমতে, ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এর উপস্থিতিতে পর্যটনশিল্পের বিকাশে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর-এমওইউ হয়। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন তৎকালীন পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজজামান খান কবির এবং ভুটানের পক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোবদেন রাবগি।
চলতি বছরের ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ভুটান-বাংলাদেশের সচিব পর্যায়ের অষ্টম বৈঠকে পর্যটনশিল্পের বিকাশে উভয় দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তে এসেছে। তবে আগের সমঝোতার আলোকে কাজের গতি শম্বুককে হার মানাচ্ছে। কেননা সেই এমওইউ অনুযায়ী কোনো জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপও আজ অবধি করা হয়নি।
পর্যটননির্ভর ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম দেশ হওয়ায় উভয় দেশের মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার মাত্রাও বেশি। ভুটানের সরকার ১৯৭৪ সালে পর্যটন বিকাশের কাজ শুরু করে। দেশটির রাজস্ব আয়ের প্রধানখাত হচ্ছে পর্যটন। ১৯৭৪ সালে ২৮৭ জন পর্যটক ভুটান সফর করেন। তখন থেকেই ভুটানে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৯২ সালে তা ২৮৫০-তে উত্তীর্ণ হয়। নাটকীয়ভাবে ১৯৯৯ সালে তা ৭১৫৮ এ উত্তীর্ণ হয়। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে পর্যটনখাত থেকে জাতীয় রাজস্বেখাতে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার যুক্ত হয়। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভুটান পর্যটন করপোরেশন (বিটিসি) অর্ধ স্বায়ত্তশাসিত এবং নিজস্ব-অর্থায়নে সরকারের পর্যটননীতি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সেই ১৯৯১ সালের অক্টোবরে ভুটান সরকার পর্যটনখাতে প্রাইভেট কোম্পানির উদ্যোগ এবং কার্যক্রম আরও সহজতর করার জন্য করপোরেশনকে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। বর্তমানে প্রায় ৭৫টিরও বেশি নিবন্ধিত পর্যটন কোম্পানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভুটানের রাজধানী থিম্পু এবং ভুটানের পশ্চিমে অবস্থিত শহর পারু, ভারতের নিকটবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। পারু তাকসাং, একটি উঁচু পাহাড়িঞ্চলে অবস্থিত মন্দির (বাংলায় যাকে বাঘের খাঁচা বলা হয়), ভুটানের দর্শনীয়স্থানসমূহের অন্যতম। এ তীর্থস্থানটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি স্বর্গীয় উপহারের মতো। এই মন্দিরের ভিতরে কক্ষে রয়েছে একটি গুহা যেখানে বৌদ্ধ দেবতা বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য প্রায় ৯০ দিন উপবাস রাখে রাক্ষস দেবতাদের। যারা ঐ উপত্যকায় বসবাস করতো তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভুটানে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরটি প্রায় এক হাজার বছর ধরে সেখানে অক্ষত অস্থায় রয়েছে। ভুটানে বিমান সেবায় তখন শুধুমাত্র দ্রাক এয়ার কাজ করত, বর্তমানে ভুটান এয়ারলাইন্সও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ভুটানের ভিসা প্রায় প্রতিটি দেশে ভুটান দূতাবাসের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যায়।
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে কত সংখ্যক পর্যটক ভুটানে ভ্রমণে যায় তার সঠিক তথ্য বাংলাদেশ ও ভুটান কোনো দেশের দূতাবাস থেকে পাওয়া যায়নি। তবে ২০২০ সালের ভুটান পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে জানা যায়, দেশটিতে বিগত ১০ বছরে পর্যটকদের সংখ্যা ১০ গুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে মোট ২ লাখ ৭৪ হাজার পর্যটক ভুটানে যায়। তাদের মধ্যে ২ লাখই ভারত, বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের। তার মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাই ১ লাখ ৮০ হাজার।
বাংলাদেশের পর্যটকরা ভারত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, নেপালসহ কয়েকটি রাষ্ট্রে অধিক পরিমাণে ভ্রমণ করে থাকেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র-বিবিএস ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট ২০২০-২১ শীর্ষক জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে পরিচালিত জরিপটির ২০২১ সালে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
জরিপের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৩৯৪১৭ হাজার খানার মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১১৬৭ হাজার পর্যটক ২ দশমিক ৯৬ ভাগ খানা কমপক্ষে একবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সেই বছর ২৯২১.৫২ হাজার বাংলাদেশি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। গড়ে প্রতিটি যাত্রায় ১ দশমিক ৮৭ জন বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। তাদের বিদেশে স্থিতিকাল ছিল ৫ দশমিক ৭৬ রাত। এসব ভ্রমণকারীর মধ্যে ৯৪৪ দশমিক ৭৪ হাজার খানা অর্থাৎ ৬০ দশমিক ৪১ ভাগ ভারতে, ১২৭ দশমিক ০২ হাজার অর্থাৎ ৮ দশমিক ১২ ভাগ সৌদি আরবে, ৭১ দশমিক ৪৫ হাজার খানা অর্থাৎ ৪ দশমিক ৫৭ ভাগ মালয়েশিয়ায়, ৩৯ দশমিক ৭০ অর্থাৎ ২ দশমিক ৫ ভাগ থাইল্যান্ডে ও অন্যান্য দেশে ৩৮১ দশমিক ০৭ অর্থাৎ ২৪ দশকি ৪ ভাগ ভ্রমণ করেছেন। মোট ভ্রমাণকারী খানার সংখ্যা ১৫৬৩ দশমিক ৯৭ হাজার বা ১০০ ভাগ। কমপক্ষে একবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ১১৬৭ খানা, যার শতকরা হার হচ্ছে ২ দশমিক ৯৬। বিদেশে ভ্রমণে প্রতিযাত্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রতিজনে ব্যয়ের পরিমাণ ৮৯ হাজার ৬৫৪ হাজার টাকা।
বাংলাদেশের পর্যটকদের মধ্যে বেশিরভাগ ভ্রমণই নাড়ির টানে অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ সংক্রান্ত। এই হার ৪৫ দশমিক ১১ ভাগ। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ১৫ দশমিক ৭৬ ভাগ ও ছুটি-অবসর বা বিনোদন করতে ১২ দশমিক ৭৭ ভাগ মানুষ বিদেশ গেছেন। যেহেতু আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতই বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের প্রধান উদ্দেশ্য সেহেতু ৪৭ দশমিক ৯৭ অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে রাত্রিযাপন করেছেন।
ভ্রমণে বাংলাদেশিদের সর্বাধিক পছন্দ হচ্ছে বাস সেবা। বিদেশে ভ্রমণে ৪৮ দশমিক ০১ ভাগ বাসে ভ্রমণ করেছেন। রেলে বিদেশ গেছেন ১৮ দশমিক ৪৫ ও আকাশপথে ছিলেন ১১ দশমিক ২২ ভাগ ভ্রমণকারী। ডিসেম্বর মাসে ছুটি ও ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার পরে বেশির ভাগ ভ্রমণ হয়ে থাকে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ মাসে ১৩ দশমিক ৭১, এপ্রিলে ১১ দশমিক ১৭ এবং জানুয়ারি মাসে ১০ দশমিক ৬৬ ভাগ ভ্রমণ হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি মানুষ বিদেশে ভ্রমণ করে ঢাকা বিভাগের। এই হার ২৫ ভাগ, খুলনায় ১৯ দশমিক ৮৪ ও সিলেটের ১৭ দশমিক ৬৬ ভাগ। সর্বনিম্ন ভ্রমণকারী বিভাগ হচ্ছে ময়মনসিংহের। এই হার শূন্য দশমিক ৫৪ ভাগ।
বিদেশে ভ্রমণকালে অর্থব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যারমধ্যে দেশেই ব্যয় হয়ে গেছে ৭৪ হাজার ৯৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার শতকরা হার হচ্ছে ২২ দশমিক ২৫ ভাগ। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাখাতে ব্যয় ছিল ২৯ দশমিক ৪৯ ভাগ, পরিবহনে ২৫ দশমিক ২৮ এবং কেনাকাটায় ২২ দশমিক ৯৪ ভাগ অর্থ। পল্লি অঞ্চলের ২৬১০ ও শহরের ২৩৯০সহ মোট ৫ হাজার খানা জরিপের আওতাভুক্ত ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৪১৬ দশমিক ৬৭ হাজার খানার মধ্যে বছরে একবার বিদেশে ভ্রমণ করেছেন ১ হাজার ১৬৭ দশমিক ০২ হাজার খানা।
একটি খানা যে শিল্প থেকে বেশি আয় করে সেটিকে প্রধান শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয় জরিপে। সে হিসেবে সেবাখাতের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এ হার তাদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৪ ভাগ, কৃষিতে ২৯ দশমিক ১৫ ও শিল্পখাতে ৬ দশমিক ৮০ ভাগ। সেবা ও বিক্রয়কর্মীদের মধ্যে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ২১ দশমিক ৭৭ ভাগ, দক্ষ কৃষি, বনজ ও মৎস্যশ্রমিকদের মধ্যে ১৯ দশমিক ০৫, প্রাথমিক পেশা ১৪ দশমিক ২৯ এবং ব্যবস্থাপক ৪ দশমিক ৭৬ ভাগ। এসব বিদেশে ভ্রমণকারীর বয়স ২৫ থেকে ৫৯ বছর। যার গড় হচ্ছে ৫৯ দশমিক ৫১ ভাগ। এসব ভ্রমণকারীর ১৪ দশমিক ৯৫ ভাগ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করেছেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক হাওলাদার দীর্ঘদিন যাবত এ শিল্পটির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভুটানের মধ্যে পর্যটনশিল্প বিকশিত করতে হলে যাতায়াত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। ভুটানের সঙ্গে বিমান চলাচল বাড়াতে হবে। যেহেতু ভুটানের পর্যটনশিল্প খুবই সমৃদ্ধ সেক্ষেত্রে আমরা তাদের থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আর ভুটানে দেখলাম তারা হাতেগোনা কিছু পর্যটক নেয় কিন্তু আয় করে বেশি। তাদের বিপুল সংখ্যক লোকজনের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটনের মাধ্যমে। হোটেলে থাকা, খাওয়া, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত সবই সুশৃঙ্খল।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উপব্যবস্থাপক (পিটিএস) মো. আকতার আহমেদ বলেন, ২০১৯ সালের পর্যটনশিল্পের বিকাশে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে তার আলোকে দুই দেশের ৭ থেকে ৯ জন সদস্যকে নিয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি। এটি করতে পারলে অনেক কাজ সহজ হয়ে যেতো। ভুটান অধিক সংখ্যক পর্যটককে না নিয়ে বরং বেছে-বেছে নেয়। এ ক্ষেত্রে তারা নিদেজের সেবার মানটি ধরে রাখতে পারে। পর্যটনশিল্পে তারা ভালো সুনাম অর্জন করেছে। আমরা নিজেদের পর্যটনশিল্পকে সমৃদ্ধ করতে তাদের সহযোগিতা ও কার্যক্রমগুলো থেকে শিখতে পারি।
লিংকার্স ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এন্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর এম এ বকর বলেন, তরুণ পর্যটকদের জন্য ভুটান আদর্শ ও আকষণীয় স্থান। ৫০-৬০ বছরের মানুষদের জন্য তেমন কিছু নেই। কেননা আমি নিজেও এ বয়সে এসে ভুটানের দিকে হয়তো যেতে চাইবো না। তবে সেখানকার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা ভালো। পর্যটকদের নিরাপত্তা ভালো।









