দেশে প্রতি দশ বছর পরপর আদম বা জনশুমারি হয়ে এলেও করোনা মহামারির কারণে নির্ধারিত সময়ে তা সম্ভব হয়নি। দুই দফায় সময় পরিবর্তন করেও করা হয়নি। গেল বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ষষ্ঠ জনশুমারি জনশুমারি পরিচালনা করার কথা থাকলেও করোনার কারণে ৯ মাস পিছিয়ে ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। তবে সেই সময়ও ভেস্তে গেছে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলছিলেন, ট্যাব সমস্যা যুক্ত হওয়ায় পিছিয়ে গেছে জনশুমারি।
অর্থাৎ অর্থাৎ সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিকতার ছোঁয়ায় জনশুমারি করতে বিলম্ব করছে সরকার। এ লক্ষ্যে কয়েকটি তারিখ দিয়েও সে অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি বছরের মার্চ মাসে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, আগামী দু’এক মাসের মধ্যেই তারা কাজটি শুরু করতে পারবেন। পরিকল্পনামন্ত্রী গেল বছরে জানিয়েছিলেন, আগামীতে আর হাজার কোটি টাকা খরচ করে জনশুমারি করার প্রয়োজন হবে না। সেজন্য এক দশক অপেক্ষা করাও লাগবে না। বলেছিলেন, এক সময় ঘড়ির কাঁটার মতোই চোখের সামনে টিকটিক করবে জনশুমারির তথ্য। এক ক্লিকেই মাথা গুনতির খবর সামনে আসবে।
মূলত, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে প্রথম আদম শুমারি পরিচালিত হয়। প্রথম আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৪ লাখ। একইভাবে ১৯৮১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৯৯ লাখ ১২ হাজার। আর তা বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২ দশমিক ৩৫ জন।
১৯৯১ সালের হিসাব মতে, দেশের জনসংখ্যা ছিল ১১ কোটি ১৪ লাখ ৫৫ হাজার। বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২ দশমিক ১৭ জন। ২০০১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে হয় ১২ কোটি ৩৮ লাখ ৫১ হাজার ১২০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৩৮ লাখ ৯৪ হাজার ৭৪০ জন আর নারী ৫ কোটি ৯৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮০ জন। গ্রামীণ পর্যায়ে ৯ কোটি ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ৯২০ অর্থাৎ ৯৫.২৫ শতাংশ শহুরে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৫ হাজার ২০০ জন।
২০১১ সালে এসে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৭ জনে। তারমধ্যে পুরুষ ৭ কোটি ২ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ ও নারী ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১ জন। এ সময়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে ১০৪৭ জন বাস করতো সেখানে বাংলাদেশ করতো ৯৭৬ জন লোক। বিশ্বের মধ্যে সিঙ্গাপুরে প্রতি কিলোমিটারে সবচেয়ে বেশি লোকের বাস ছিল। সেখানে ছিল ৭১৮৭ জন। আর সবচেয়ে কম ছিল অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ৩ জন।
১৯১১ সালে বঙ্গ অঞ্চলে প্রতি কিলোমিটারে মানুষের বসবাস ছিল ২৭৪ জন। এটি ২০১১ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৭৬ জনে। এ হিসেবে শতবর্ষের ব্যবধানে বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে ৭০২। দশক হিসেবে ১৯৪১ হতে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে প্রতি কিলোমিটারে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ছিল কম। এ সময় কিলোমিটারে ২৯৯ জন অর্থাৎ ৪.৯১ শতাংশ। ১৯৬১ হতে ১৯৭৪ পর্যন্ত হারটি সবচেয়ে বেশি।
১৯০১ সালে প্রতি কিলোমিটারে বসবাসের সংখ্যা ছিল ১৯৬ জন, ১৯১১ সালে ২১৪, ১৯২১ তে ২২৫, ১৯৩১ তে ২৪১, ১৯৪১ তে ২৮৫, ১৯৫১ তে ২৮৪, ১৯৬১ তে ৩৪৫, ১৯৭৪ তে ৪৮৪, ১৯৮১ তে ৫৯০, ১৯৯১ তে ৭২০ ও ২০০১ সালে ৮৩৯ জন এবং ২০১১ সালে এটি দাঁড়ায় ৯৭৬ প্রতি কিলোমিটারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে জনশুমারি বিশেষ গুরুত্ববহন করে। কেননা দেশে কত মানুষ আছে, তাদের পেশা, বয়স ও যোগ্যাতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ যাবতীয় কাজ করতে সুবিধা হয়। এক্ষেত্রে ১০ বছর পর পর জনশুমারি হয়ে থাকে। এবার কিছুটা দেরি করে জনশুমারি হচ্ছে। আশা রাখি জনগণের সঠিক তথ্যটি উঠে আসবে।
১৫৮২ সালে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ভারতবর্ষে প্রথম জরিপ ও ভূমি জরিপ পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আদমশুমারি হয় ১৭৯০ সালে এবং পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে ১৮০১ সালে আদমশুমারি পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ে আদমশুমারি একটি জনগোষ্ঠীর বা দেশের জনসংখ্যা গণনার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহ। তথ্য একত্রীকরণ এবং জনমিতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক তথ্যাদি প্রকাশ করা বোঝায়। আদমশুমারিতে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ১. প্রতিটি ব্যক্তির তথ্য গণনা, ২. একটি চিহ্নিত এলাকায় সামষ্টিক গণনা, ৩. একই সঙ্গে সারাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা এবং ৪. নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠান।
আদমশুমারির জন্য সুপারিশ করা প্রয়োজনীয় বিষয়াদির মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য: আদমশুমারির সময় যেখানে পাওয়া গেছে অথবা যেখানে বাস করেন, জন্মস্থান, বর্তমান বাসস্থানে কতদিন যাবত বাস করছেন, পূর্বের বাসস্থান, কর্মস্থান; দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত এবং বাড়ি সংক্রান্ত তথ্যাদি: লিঙ্গ, বয়স, বাড়ির প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক, পরিবার প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈবাহিক অবস্থা, বিবাহের মেয়াদকাল, বিবাহক্রম, মোট জীবিত জন্মগ্রহণকারী সন্তান সংখ্যা, বর্তমানে জীবিত সন্তানসংখ্যা, নাগরিকত্ব, শিক্ষা, স্কুলের উপস্থিতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষাগত অর্জন, জাতীয়/নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ভাষা, ধর্ম এবং তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য কর্মের ধরন, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবন ধারণের প্রধান উৎস্য।
এসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আরো কিছু তথ্য আদমশুমারির জন্য প্রয়োজনীয়। ১. ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ: জনসংখ্যার সমষ্টি, এলাকা-শহর, গ্রাম, ২. ব্যক্তিগত এবং বাড়িসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য: পরিবারের গঠন, বাড়িতে বসবাসকারী সদস্যদের গঠন, ৩. অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য: আর্থ-সামাজিক অবস্থা, নির্ভরতা ইত্যাদি। আইনত অথবা কার্যত পদ্ধতিতে আদমশুমারির প্রতিটি মানুষকে আবাসিক অথবা কোনো একটি এলাকায় উপস্থিত হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রাচ্য অথবা প্রতিচ্যের মধ্যযুগীয় সরকারসমূহ কর অথবা সামরিক বাহিনীতে জনসাধারণের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনে কখনো কখনো আদমশুমারির আশ্রয় নিতেন। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম উইলিয়ম ১০৮৬ সালে ডুমস ডে বুক অথবা ডোমসডে বুক নামে জমি অথবা জমিতে বসবাসকারী মানুষের একটি জরিপ পরিচালনা করেন। এটি ইতিহাসের সর্বপ্রথম নথিভুক্ত আমদশুমারি হিসেবে পরিচিত।
একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারতের সৃষ্টি হয়। সেই পাকিস্তানের প্রথম আদম শুমারি ১৯৫১ সালে মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫৬ লাখ ৭২ হাজার ৪৬৯ জন। তারমধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪২ জন। নারী ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৮ হাজার ১৫৪ জন। সেখানে পূর্বপাকিস্তানে ৪ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৩২৯ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ জন।
আর ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় আদম শুমারিতে দুটি প্রদেশে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজা ৬১৩ জন। নন পাকিস্তানি ছিল ১১ হাজার ৩৬৯জন সহ মোট জনসংখ্যা ছিল ৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩১ হাজার ৯৮২ জন। এই ১০ বছরে বৃদ্ধিার হার ২৩.৯ শতাংশ। তার মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৮ হাজার ৬৪৫ জন ও নন পাকিস্তানি ১৩৪৮৬ জনসহ মোট ৫ কোটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৭২১ জন ও নারী ৪ কোটি ৪৪ লাখ ১১ হাজার ৯৬৮ জন সেখানে নন পাকিস্তানি ৯৭৮৮৩সহ মোট জনসংখ্যা দাঁড়য়ি ৪ কোটি ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ২৬১ জন। সেখানে পূর্বপাকিস্তানে পুরুষ ৫ কোটি ৮ লাখ ৪০ হাজার ২৩৫ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৩৭৮ জন।
বিশ্বের জনসংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, এ সময় চীনের জনসংখ্যা ৬৪ কোটি ৬৫ লাখ ৩০ হাজার ও হার ছিল ২.৮। ভারতে ৪৩ কোটি ৪৮ লাখ ৮৪ হাজার ৯৩৯ ও হার ছিল ২.২। পাকিস্তানে ৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩১ হাজার ৯৮২ জন ও হার ছিল ২.২। ব্রাজিলে ৭ কোটি ৯ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৫ জন ও হার ছিল ৩.৬। অর্থাৎ ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্যে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৬ জন ও হার ০.৭।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানে ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষ ছিল ৮৮.০৯ শতাংশ। তারমধ্যে পূর্বপাকিস্তানে ৮০.৪৩ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৯৭.১৭ শতাংশ। সনাতন ৪.৯০ শতাংশ, পূর্বপাকিস্তানে ৮.৬৩ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ০.৪৮ শতাংশ। সিডোলেড কাস্ট ৫.৭৭ শতাংশ, পূর্বপাকিস্তানে ৯.৮২ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ০.৯৭ শতাংশ। খ্রিস্টান ০.৭৮ শতাংশ, পূর্বে ০.২৯ ও পশ্চিমে ১.৩৬ শতাংশ। বৌদ্ধ ০.৪০ শতাংশ, পূর্বে ০.৭৪ ও পশ্চিমে ০.০১ শতাংশ। অন্যান্য ০.০৬ শতাংশ, পূর্বে ০.০৯ ও পশ্চিমে ০.০১ শতাংশ। ১৯১১ সালে পূর্বে ইসলাম ধর্মালম্বী ১১, সনাতন ৪ ও অন্যান্য ৪৯ শতাংশ ও পশ্চিমে যথাক্রমে ১৯, ৩, (খ্রিস্টান ২৭২) অন্যান্য ১০১।
১৯৫১ সালের কোনো আদম শুমারিতে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের তথ্য লিপিবন্ধ নেই। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিনবোধি ভিক্ষু দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, ১৯৫১ সালের আগের আদম বা জনশুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর কারণ হচ্ছে তখন আমাদের মধ্যে এতো সচেতন লোক ছিল না। ফলে আমাদের জনশুমারিতে আনা হয়নি। অথচ আাড়াই হাজার বছর আগে থেকে এ অঞ্চলে বৌদ্ধদের বসবাস অবিভক্ত ভারতে। পাহাড়পুর ও চট্টগ্রামের সঙ্গে জড়িত। পাল সাম্রারাজ্য ধ্বংসের পর আর কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা কোনো শাসক দেয়নি। ইংরেজরা কিছুটা দিয়েছিল। সে কারণে বৌদ্ধরা সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।
পাহাড় ও সমতলে ধর্মান্তরিত তথা খ্রিস্টান ধর্মালম্বী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কি এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক জিনবোধি ভিক্ষু বলেন, খ্রিস্টান বানানোর জন্য নানান ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। এসব টাকা-পয়সা দিয়ে পড়ালেখাসহ নানা কাজ করে। এতে করে তারা খ্রিস্টান ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
আনন্দবাজার/শহক









