জাহাজভাঙা শিল্পে টানা দুই দফায় বিশ্বের শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দেশের বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলে গড়ে উঠেছে বিশাল আকারের এ শিল্প। যাকে ঘিরে সারা দেশেই গড়ে উঠেছে ইস্পাত শিল্প। বিগত ২০১৯ সালে বিশ্বে ৬৭৪টি সমুদ্রগামী পুরোনো জাহাজ বিক্রি হয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাই কিনেছেন ২৩৬টি জাহাজ। যে কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জাহাজ ভাঙার শিল্প গড়ে উঠেছে সীতাকুণ্ডে। তবে সম্প্রতি তিরিশ বছরের পুরোনো পরিত্যক্ত শতকোটি টাকা মূল্যের এক জাহাজের লোহা লুটপাটের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী উপকূলে দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল মালিকবিহীন জাহাজটি। যে জাহাজটির দিকে কারো দৃষ্টিই ছিল না। সম্প্রতি লোহা বা স্ক্র্যাপের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে পরিত্যক্ত সেই জাহাজটির ওপর। রাতের আঁধারে জাহাজটির লোহা কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
গত কয়েক মাস ধরেই স্ক্র্যাপ লোহার দাম বাড়ছে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই টন প্রতি বেড়েছে প্রায় তিন হাজার টাকা। লোহার এই দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে যেমন স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে লোহার চোর চক্রের অপতৎপরতাও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। এসব চক্রের এখন প্রধান টার্গেট ভাটিয়ারী উপকূলের পরিত্যক্ত সেই জাহাজ। বেশ কিছুদিন ধরে জাহাজটি থেকে রাতের আঁধারে লোহা কেটে নিয়ে যাচ্ছে বিশেষ এক সিন্ডিকেট। নানা কৌশলে সেই চক্র জাহাজের লোহা লুটপাট করলেও প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
সূত্রমতে, ১৯৯৩ সালের দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পথে যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ে এমভি রয়েল বার্ড নামের জাহাজটি। সাগরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে ক্যাপ্টেন দ্রুত জাহাজটিকে সন্দ্বীপ চ্যানেলের দিকে সরিয়ে নেন। একপর্যায়ে জাহাজটি সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী উপকূলে নিয়ে গিয়ে চরে আটকে দেয়া হয়। সেই থেকে অরক্ষিত অবস্থায় জাহাজটি ভাটিয়ারী উপকূলে পড়েছিল। পরবর্তীতে জাহাজটির মালিক সেটিকে ঢাকার কোনো একটি এতিমখানাকে দান করে দিয়েছেন বলে প্রচারণা চালায় একটি মহল। তবে কোন এতিমখানাকে দেয়া হয়েছে তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। তাছাড়া এখন পর্যন্ত জাহাজটির মালিকানা দাবিও করেনি।
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় উপকূলীয় এলাকায় তৎপর থাকা লোহা চোর চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে জাহাজটির নানা অংশ কেটে নিয়ে গেছে। এভাবে লুটপাটের পরও শত কোটি টাকা মূল্যের জাহাজটিতে লোহাসহ নানা সামগ্রী ছিল। সরকারিভাবে জাহাজটি জব্দ ও বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সরকারি কোষাগার জমা দেয়া, কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণকাজে ব্যয় করতে স্থানীয়রা দাবি তুললেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এ কারণে বছরের পর বছর ধরে পরিত্যক্ত জাহাজটি অরক্ষিত অবস্থায় উপকূলে পড়ে থাকে।
তবে বেশকিছুদিন ধরে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ লোহার দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এতে টাকা দিয়েও স্ক্র্যাপ লোহা কিনতে না পারার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ বিক্রির ঘোষণা দেয়া মাত্রই ক্রেতারা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। ইয়ার্ড মালিকেরাও প্রতিদিন নিলামের মাধ্যমে স্ক্র্যাপ বিক্রি করছেন। নিলাম ডাকে যে ক্রেতা বেশি দাম হাঁকছেন তাকেই জাহাজের স্ক্র্যাপ লোহা দেয়া হচ্ছে। এমন তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে স্ক্র্যাপের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের সংকট দিয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, লোহার বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বাড়ার কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র এমভি রয়েল বার্ড থেকে লোহা সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিনই জাহাজের লোহা কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নানা কৌশলে শত শত টন লোহা লুটপাট করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রমতে, প্রভাবশালী চক্রটি একদল শ্রমিককে জাহাজ কাটার কাজে নিয়োজিত করেছে। জাহাজের অর্ধেকের বেশি অংশ ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে।
ভাটিয়ারী শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক মো. নায়িম শাহ বলছেন, শুনেছি স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজনের নেতৃত্বে জাহাজটি কাটা হচ্ছে। তারা মালিকের কাছ থেকে জাহাজটি কিনে নিয়েছেন বলে দাবি করছেন। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেন, দুজন ব্যক্তি জাহাজটি কিনে নিয়েছেন বলে তারা আমাকে জানিয়েছেন। সেজন্য বৈধ কাগজপত্র ও ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করার বিষয়টি জানতে চেয়েছি। অবশ্য জাহাজটির বেশিরভাগ অংশই চুরি হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সীমানায় জাহাজ কাটলে দুর্ঘটনার দায়ভারও তাদের নিতে হবে। লাইসেন্স নবায়ন না থাকলে জাহাজ কাটা যাবে না। খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মো. আবু তাহের বলেন, জাহাজটি অনেক পুরাতন হওয়ায় এটার বিষয়ে আমাদের কোনোরকম তথ্য নেই।
জাহাজটি উদ্ধার করে জনকল্যাণ ও সেবামূলক কোনো কাজে ব্যবহারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।









