- হাটবাজারে কোটি কোটি টাকা আয়
এক যুগ আগে হাটের রাজস্ব আয় ছিল লাখ টাকার কোটায়। তখন হাটে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য ছিল ফাঁকা জায়গা। তাঁরা সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে পণ্য বিক্রি করতেন। এখন রাজস্ব আয় কয়েক কোটি টাকা হলেও কৃষকেরা জায়গার অভাবে হাটে ভোক্তার কাছে যেতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে কমমূল্যে পাইকার ও আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ক্রেতা ও উৎপাদকের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান হচ্ছেন বেশি।
রংপুর বিভাগের অন্তত ৪৪৭টি হাটের চিত্র এরকম। ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভিযোগ, হাট থেকে সরকারের রাজস্ব আয় লাখ থেকে কোটি টাকা পেরোলেও জায়গা সংকটের কারণে কৃষকেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করেন। হাটে আগতদের জন্য শৌচাগার থাকলেও তা নষ্ট। ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য নেই নির্দিষ্ট জায়গা। দীর্ঘদিন ধরে ময়লা জমে নালাগুলো ভরাট হওয়ায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। বৃষ্টির দিনে ময়লা পানি উপচে সড়ক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকছে।
হাটে কৃষকেরা সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে পণ্য বিক্রি করতে না পারায় ৫০ গজের মধ্যে দ্বিগুণ দামে সেই পণ্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। দুই টাকার লেবু নিতে হচ্ছে ১০ টাকায়।
বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগ। এ বিভাগে রয়েছে ছোট বড় ১১’শ ২টি হাট। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট রয়েছে ৪৪৭টি। এসব হাটে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন পশুর হাট বসে । প্রতি হাটে ৭০০ থেকে ৮০০ পশু কেনাবেচা হয়। এ ছাড়া ধান, পাট, আলুসহ নানা রকম সবজি কেনাবেচা হয়। চলতি বছর এসব হাট গড়ে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব কিছুর উন্নয়ন ঘটলেও এসব হাটের তেমন উন্নয়ন চোখে পড়ে[ না । হাটগুলো যেন জিম্মি কতিপয় ইজারাদারের কাছে ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটগুলোতে সবজি ও চাল বিক্রির জন্য কোনো শেড নির্মাণ করা হয়নি। কৃষকদের আদা, হলুদ, ধান, পাট, সবজি, মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, ডালি-কুলা, মাদুর বিক্রিরও জায়গা নেই। স্থান সংকুলান না হওয়ায় কৃষকেরা কিশোরগঞ্জ-তারাগঞ্জ সড়কের ওপর পণ্য বিক্রি করছেন। ক্রেতার ভিড়ে এক কিলোমিটার সড়ক হাটে পরিণত হয়েছে। এরে মধ্যে দিয়ে ঠেলাঠেলি করে অতি কষ্টে চলাচল করছে যানবাহন।
বিভিন্ হাটে কথা হয় একাধিক সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে। তারা বলেন, ‘এক থেকে দেড় যুগ আগে হাটে তাঁবু টাঙিয়ে কুপি জ্বলে কৃষকেরা ফসল বিক্রি করত। আমরা টাটকা সবজি কম মূল্যে কিনতাম। কিন্তু এখন সে সুযোগ নেই। কৃষকেরা হাটে এসে ফসল বিক্রির জায়গা পাচ্ছেন না। পাইকারের কাছে বিক্রি করছেন। পাইকারেরা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে আমরা কিনে খাচ্ছি। এতে কয়েক হাত ঘুরে পণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি গুনতে হচ্ছে।’
সবজির খুচরা বাজারে কথা কৃষক জোবেদুল ইসলামের সঙ্গে। সেখান থেকে আঙুল উঁচিয়ে ৫০ গজ দূরে নির্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ওই যে লোকজন দেখতেছেন, ওটা সবজির পাইকারি বাজার। এক মণ বেগুন ওখানে এক হাজার ২০০ টাকায় বেচলাম। সেই বেগুন এখানে খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি। সেই হিসেবে খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা মণ। রোদে পুড়ে চাষ করে এক মণ বেগুনে ৫০ টাকা লাভ হয় না। আর এক মিনিটের পথে তাঁরা ৬০০ টাকা লাভ করছেন। আমাদের কষ্ট করে ফসল ফলানোই হবে, ন্যায্য মূল্য পাব না! হাটে যদি খুচরা বিক্রি করতে পারতাম তাহলে ৩০০ টাকা লাভ থাকত। এতে ক্রেতাও লাভবান হতো।’
রংপুর বিভাগীয় ক্ষুদ্র বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল হক জানান, হাটগুলোর এ দুরবস্থা দীর্ঘদিনের। দোকানপাট উচ্ছেদের পর ব্যবসায়ীরা বাজারগুলোর ভেতরে ধান, পাট, গমসহ কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির নির্দিষ্ট জায়গা রাখার অনুরোধ স্থানীয় প্রশাসনকে করেছিলেন কিন্তু শোনেনি। জায়গার অভাবে কৃষক এখন রাস্তার ওপর হাট বসায়। ফলে যানবাহন, পথচারী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় সমস্যায়।
স্থানীয় এক হাটের ইজারাদার স্বপন চৌধুরী জানান, শুধু কৃষকদের ফসল বিক্রির জায়গার সংকটই নয়, হাটগুলো নানা সমস্যায় জরাজীর্ণ। সামান্য বৃষ্টিতে কাদাপানির সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শৌচাগারগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বিষয়গুলো প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
সুজন রংপুর মহানগরের সভাপতি ফখরুল আনাম বেণ্জু জানান, হাটগুলোকে ঘিরে এক ধরনের টাউট বাটপারদের বেপরোয়া সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে । প্রশাসনের উচিত সবার আগে এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে হাটবাজারগুলোকে প্রান্তিক মানুষের জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা । তবেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হাটবাজারগুলোর উন্নয়ন হবে ।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব ভুইয়া বলেন, ‘হাটের সমস্যা সমাধানের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসা হবে। সবার সঙ্গে কথা বলে হাটের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এছাড়া হাট কেন্দ্রিক যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে তা ভেঙ্গে দিতে জেলা প্রশাসকদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।









