করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডাব্লিউএইচও) বিশেষজ্ঞরা ভয়াবহ কোনো আশঙ্কার কথা না বললেও বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও গেল এক সপ্তাহ ধরে করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকেও ১৬ দফা নির্দেশনা ইতোমধ্যে জারি করা হয়েছে। আরো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয় নিয়ে মিশ্র আলোচনা চলছে।
সূত্রমতে, গেল সপ্তায় ৩ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে নতুন করে ৭ হাজার ২৩৪ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। তার আগের সপ্তায় শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২১৩ জনের। ফলে আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্তের হার বেড়েছে ১২৫ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে দেশে এখন পর্যন্ত ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে ৩০ জনের শরীরে। বিদায়ী বছরের জুলাই-অগাস্টে দেশে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটের সময় দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে সেটা নামতে নামতে ২ শতাংশের নিচে চলে আসে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আসে বলা যায়। তবে এর মধ্যেই হঠাৎ বিশ্বে শুরু হয় ওমিক্রনের সংক্রমণ। আর ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ৪ জানুয়ারি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিকসহ সব ধরনের জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৬ দফা নির্দেশনা দেয়। তবে তার আগের দিন ৩ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ৩ শতাংশ। নির্দেশনা জারির পরদিন ৫ জানুয়ারি তা বেড়ে ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর ১১ জানুয়ারি দুই হাজার ৪৫৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হলে হার বেড়ে ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিধিনিষেধ আরো কঠোর করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
এর অংশ হিসেবেই গত ১০ জানুয়ারি মাস্ক ছাড়া রাস্তায় বের হলে জরিমানার বিধানসহ ১১ দফা বিধি-নিষেধ জারি করে সরকার। যা ১৩ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হয়। যদিও এই সময়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়, ১৫ জানুয়ারির পর অন্তত এক ডোজ টিকা নেওয়া ছাড়া ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্লাসে যেতে পারবে না।
১১ দফার নির্দেশনা নিয়ে বিতর্ক
সভাসমাবেশ বন্ধে জাতীয় কমিটি ও সরকার প্রজ্ঞাপন দিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলবে। আবার টিকার সনদ দেখিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার বিষয়ে সরকার যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সেটাকে অবাস্তব বলছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। আবার জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে দেশের করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আর বাণিজ্য মেলার মতো জায়গায় কখনোই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব নয়। তারা বলছেন, বাণিজ্য মেলা চলছে, পিঠা উৎসব চলছে, রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে, নির্বাচন চলছে- এসব স্পষ্টতই ১১ দফার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জনস্বাস্থ্যবিদ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সালও বলছেন, বাণিজ্য মেলা, বিভিন্ন জায়গায় পিঠা উৎসব, বিয়ে বাড়িতে উৎসব, পর্যটন কেন্দ্রসহ সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে কখনোই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। ১১ দফা যেটা দেওয়া হয়েছে, সেটা কেবলই দেওয়ার জন্য দেওয়া। এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কে বাস্তবায়িত করবে, কে তদারকি করবে—তার কোনও নির্দেশনা নেই।
আবু জামিল ফয়সাল তার অভিজ্ঞতার বিষয় উল্লেখ করে বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, তদারকির ব্যবস্থা না থাকলে সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয় না। এটা কাগজে লেখা, লেখাই থাকবে আর কিছু হবে না। ১১ দফা বাস্তবায়নের জন্য একটা সমন্বিত, সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার, যেটা আগেও হয়নি, এখনও হবে না। দফাগুলোতে বলা হয়েছে, মাস্ক পরা আবশ্যক। তবে জনমানুষের সম্পৃক্ততা না থাকলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকা, রাঙামাটি
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতে, ঢাকা ও রাঙামাটি জেলা করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক সপ্তাহের করোনার তথ্য বিশ্লেষণে এমন প্রবণতা লক্ষ করা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাধ্যম ঝুঁকি থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে গেছে ঢাকা জেলা এবং নিম্ন ঝুঁকি থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে গেছে রাঙামাটি জেলা। এই দুই জেলায় সংক্রমণ ঝুঁকি ১০-১৯ শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, লালমনরিহাট, যশোর ও দিনাজপুর জেলায় সংক্রমণ ঝুঁকি ৫-৯ শতাংশ।
মানুষের দোরগোড়ায় টিকা
বিদায়ী বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশব্যাপী টিকাদান প্রক্রিয়া শুরু করে। তারপর থেকে টিকা গ্রহণকারী মানুষের বেড়েছে। গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এখনও যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। এমনকি পুরুষদের তুলনায় টিকা গ্রহণকারী নারীদের অনুপাত কম। কারণ এখন পর্যন্ত পুরুষের তুলনায় টিকা গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ। দেখা যাচ্ছে, টিকা দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট এবং ডিভাইস নেই। প্রায়শই টিকার নিবন্ধন ও টিকার কার্ডটি মুদ্রণের জন্য বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানে ১০০/২০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
তাছাড়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকের টিকার অ্যাপটিতে অ্যাক্সেস নেই। নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কারণে বৃহৎ জনগোষ্ঠী টিকা গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। প্রাথমিক দিনগুলোতে টিকা দেয়ার স্থানে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করলেও পরে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে অধিক জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার সুবিধার্থে অনসাইট রেজিস্ট্রেশনের বিষয় পর্যালোচনা করে পুনরায় চালু করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। জনগণকে টিকা দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হতে সহায়তা করতে ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) কাজ করা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে (ইউডিসি) ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
গণমাধ্যমকে কাজে লাগানোর পরামর্শ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. প্রণব কুমার পান্ডে বলেন, উৎসাহমূলক তথ্য প্রচারের পাশাপাশি সরকার ঘরে ঘরে টিকা দেওয়ার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। আমাদের দেশের গণটিকা প্রদানের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জনের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এবং শহরগুলোতে রাস্তায় এবং বস্তিতে বসবাসকারী মানুষদের ঘরে ঘরে গিয়ে নিবন্ধন এবং টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ রয়েছে।
অন্যথায়, বিপুল সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতার বাইরে রেখে, দেশে করোনার সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা যাবে না। প্রচারণার জন্য জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হতে হবে গণমাধ্যম। বেতার, টেলিভিশনে প্রতি ঘণ্টায় করোনা পরিস্থিতি, সরকারের নির্দেশনা, টিকার তথ্য ও টিকার সুফল নিয়ে প্রচার করার পরামর্শ দেন পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল। জনযোগাযোগ ছাড়া আর সব উদ্যোগ অর্থহীন হবে বলেও মনে করেন তিনি।
মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন
বিধিনিষেধ জনগণ মানছে কি না, সেটা নিশ্চিত করতে সরকারকে মনিটরিং জোরদার করতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আলেম-ওলামারা জনগণকে সচেতন করতে ও মাস্ক পরতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এবারও তাদের সক্রিয় করা প্রয়োজন বলে মত তাদের। সেক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় দূর তাগিদ দেন তারা। জনপ্রতিনিধিরা এ ক্ষেত্রে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন। সমন্বিত প্রচেষ্টা না থাকলে কাগজে-কলমে যত ভালো বিধিনিষেধ দেওয়া হোক না কেন, তা বাস্তবায়িত হবে না। তাই আগের অভিজ্ঞতা থেকে সমন্বিত কার্যক্রম ও মানুষকে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
আনন্দবাজার/শহক









