১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু ছিল গত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মহামারি। কোভিড-১৯ এর মহামারিতে আমরা অন্তত এতটুক জেনেছি যে, সার্স সিওভি-২ নামে একটি নতুন ভাইরাস সংক্রমণের কারণে এটা হচ্ছে। তবে স্প্যানিশ ফ্লু কীসের কারণে হচ্ছে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ধরতে পারছিলেন না। যখন স্প্যানিশ ফ্লু ছড়ায় তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। এই ফ্লুয়ের জন্য দায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস আবিষ্কার করতে করতে এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে আসে।
এর নাম স্প্যানিশ ফ্লু হওয়ায় ধারণা হতেই পারে, হয়তো স্পেনই ছিল এই রোগের উৎপত্তিস্থল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা তা নয়। সংবাদ মাধ্যমগুলো অনেকটা জোরপূর্বক এই নাম প্রচার করেছে। স্প্যানিশ ফ্লু দ্বাড়া প্রায় ৫-১০ কোটি মানুষ মারা যায়। আমেরিকায় মারা যায় প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ, যা ছিল তাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত হওয়া সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। এ রোগে ব্রিটেনে মারা যায় ২লাখ ২৫ হাজার মানুষ। বাদ যায়নি ভারতীয় উপমহাদেশও। সেখানেও প্রায় ২ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ঠিক কি কারণে? এই ফ্লু এত ভয়াবহ রুপ কেন ধরেছিল? অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো এর পেছনের সঠিক কারণটা এখনও নিশ্চিত হয়ে জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে। এই তত্ত্বগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য চারটি কারণ এই আর্টিকেলে আলোচনা করা হবে।
প্রথম তত্ত্ব যেকোন ভাইরাস সম্পর্কে আমরা একটা কথা জানি যে, এদের নিজেদের স্বাধীনভাবে বংশবৃদ্ধি করার উপায় নেই। এরা মানুষ বা অন্য কোনো জীবদেহে প্রবেশ করে তাদের কোষে প্রবেশ করে অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। এতে সেই জীবদেহের কোষ ধ্বংস হতে শুরু করে। এবং ইনফ্লুয়েঞ্জাও তার ব্যতিক্রম না।
স্প্যানিশ ফ্লুয়ের জন্য দায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, তার পৃষ্ঠে এক প্রকার প্রোটিন ছিল যা ইন্টারফেরন তৈরি করতে বাধা সৃষ্টি করে। ইন্টারফেরন হচ্ছে জাতীয় প্রোটিন, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া বা ইমিউন সিস্টেমকে জানান দেয় আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা দেয়ালে বহিঃশক্তির আক্রমণ ঘটেছে। ফলে ফুসফুসের যেসকল কোষ রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে, তারা ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হয়। ভাইরাস সেই কোষগুলোর ভেতরে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। এতে কোষগুলো মরে যেতে শুরু করে। এতে কোষগুলো তখন আর অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। তাই ধারণা করা হয়, ইন্টারফেরনের নিষ্ক্রিয়তাই মরণঘাতী ভাইরাল নিউমোনিয়ার সূচনা ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয় তত্ত্ব এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সরাসরি মানুষ খুন করেনি। এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী আসলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। তারমানে কি ভাইরাস কিছুই করেনি? না তা নয়। ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রতিলিপি তৈরির কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। ফলে তখন স্টেফাইলোকক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করে। যাকে বলা হয় সেকেন্ডারি ইনফেকশন।
ফ্লুয়ের মহামারিতে মৃত্যুর পেছনে সরাসরি ভাইরাসের চেয়ে ব্যাকটেরিয়ার সেকেন্ডারি ইনফেকশনই বড় ভূমিকা রেখেছে মনে করা হয়।
তৃতীয় তত্ত্ব এই তত্ত্ব অনুসারে আমাদের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত কার্যক্রমই সবার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণে তা শরীরের নিজের কোষগুলোকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল।
ধরুন , কোনো ভাবে আপনার আঙুল কেটে গেছে। তখন ব্যাকটেরিয়া আপনার ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে শুরু করলো। এতে আপনার আঙুল ফুলে লাল হয়ে যেতে শুরু করবে। একই সাথে ওই স্থান উত্তপ্ত হতে শুরু করবে, কারণ সেখানে রক্তপ্রবাহ বেড়ে গিয়ে শ্বেত রক্তকণিকা সেখানে সরবরাহ করার জন্য। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রদাহ। এই প্রদাহ খুব বেদনাদায়ক হলেও শরীরের জন্য মূলত উপকারী। কারণ এই শ্বেত রক্তকণিকাগুলো ব্যাকটেরিয়ার বিপক্ষে যুদ্ধ করে। প্রক্রিয়াটি মুলত পরিচালিত হয় সাইটোকাইন নামক একপ্রকার মেসেঞ্জার প্রোটিনের মাধ্যমে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যখন বন্ধ হয়ে যায়, শরীরের কোষগুলো সাইটোকাইন তৈরি বন্ধ করে দেয়। তখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
তবে ১৯১৮ সালের ফ্লু সংক্রমণের সময় এই ইমিউন সিস্টেম আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। সেই সময়ের রোগীদের ফুসফুসে সাইটোকাইনের অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছিল। একে বলা হয় সাইটোকাইন স্টর্ম। অতিরিক্ত সাইটোকাইন তখন সংক্রমিত কোষগুলোর পাশাপাশি সুস্থ কোষগুলোকেও ধ্বংস করে দিতে শুরু করে।
চতুর্থ তত্ত্ব এই তত্ত্ব তখনকার পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। এটি একটি নতুন ভাইরাস ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছিল পাখি থেকে। ভাইরাস পাখি থেকে শুকর কিংবা ঘোড়ায় এ সংক্রমণ ছড়ায়। তারপর মানুষের শরীরে এসে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এটি এমন সময়ে ছড়িয়েছিল, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে মানুষ বস্তি বা ব্যারাকের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাস করতো। তখন তারা ঘরের বাইরে খুব একটা চলাচলও করতে পারত না।
শেষ কথা ১৯১৮ সালের মহামারি সম্পর্কে এখনো আমাদের অনেক কিছুই অজানা। আমরা এখনো জানি না ভাইরাসের স্ট্রেইনগুলো কেন কয়েকটি মাত্র স্তন্যপায়ীকে আক্রান্ত করে, আর অন্যদের করে না। আমরা জানি না ভাইরাসটি নতুন ভাইরাস ছিল, নাকি পুরাতন ভাইরাসেরই নতুন সংস্করণ যা পরবর্তীতে মরণঘাতি রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল।
১৯১৮ সালের পর এই ফ্লু ভাইরাসের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, কোথায় গিয়েছিল আর কেনই বা পরে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এসব কিছুই আমরা এখনও জানি না। এই তথ্যগুলো জানতে পারলে হয়তো আমরা এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ হারানোর সঠিক কারণ আবিষ্কার করতে পারব। একইসাথে এই ভাইরাস পরবর্তীতে আবার দেখা দেবে কিনা বা তার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারব কিনা সেসব তথ্যও জানতে পারব।
আনন্দবাজার/তা.তা









