- রূপগঞ্জে ২৮০ টন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি
- ৬০ ধরনের জীবাণু ছড়ায়
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা নেই, নেই সেই বাঁশির সুরও। তাই বেড়ে গেছে ইঁদুরের উপদ্রব। ইঁদুর ছোট হলেও ক্ষতি করে বিশাল। শুধু ক্ষতি বললে বোধহয় ভুল হবে। ইঁদুরের মাধ্যমে প্রায় ৬০ প্রকার রোগজীবাণু ছড়ায়। প্রতিবছর ইঁদুরের কারণে রূপগঞ্জে ২৮০ টন ফসলের ক্ষতি হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এছাড়া বাসা-বাড়ি, শিল্পকারখানা, বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি করে ইঁদুর। উপজেলার ৩৫৬টি পোল্ট্রি শিল্পের ডিম ও বাচ্চা খেয়ে ফেলার কারণে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ উপজেলায় ইঁদুরের কারণে বছরে প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে। ইঁদুর নিধন মাস উপলক্ষে গত অক্টোবর মাসে ৬০ হাজার ইঁদুর নিধন করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ নানাভাবে লোকজনদের উদ্ধুদ্ধ করার কারণে চলতি বছরে ইঁদুরের উপদ্রব কিছুটা কমে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর পাশের উপকণ্ঠ রূপগঞ্জে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে গেছে। গত ৫ বছরে উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৫ টি ইঁদুর নিধন করা হয়েছে। চলতি বছরের ইঁদুর নিধন অভিযান মাস উপলক্ষে ৬০ হাজার ৫৮২ টি ইঁদুর নিধন করা হয়েছে। তবে বেসরকারী হিসাবে এ সংখ্যা ৪ লাখের উপড়ে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগ।
বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়কে ক্ষতি: ফসলের ক্ষতির বাইরে ইঁদুর গ্রামীণ অবকাঠামো, বিশেষ করে বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি করে। তবে টাকার অঙ্কে তা এখনো নিরুপণ করা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও খাদ্য বিভাগ ইঁদুরের কারণে তাদের তৈরি করা অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষতির বিষয়টি সামনে এনেছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে ইঁদুর সাধারণের ফসলের ক্ষেতে ও গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে গর্ত করে সেখানে অবস্থান করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে নিন্মভূমি প্লাবিত হলে এবং ফসলের জমিতে বৃষ্টির পানি পড়লেই ইঁদুর গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়। উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন বলেন, ক্ষতি করে এটা ঠিক, কিন্তু কি পরিমাণ ক্ষতি হয় সে তথ্য নেই।
১২০টি প্রতিষ্ঠানে ইঁদুরের ক্ষতির চিত্র : প্রতি কেজি ডালের গড় মূল্য ৪০ টাকা হিসাবে বছরে একটি ডালের দোকান বা গুদামে ৬৫ হাজার টাকার ডাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়। এ হিসাব অনুযায়ী, ৫০ টি দোকান বা গুদামে বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪ লাখ টাকায়। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত ৫ লাখ টাকার বস্তা কেটে বিনষ্ট করে ইঁদুর। রূপগঞ্জে মুড়াপাড়া, গোলাকান্দাইল, কাঞ্চন, তারাবো বাজারে চালের আড়ৎ রয়েছে ৭০টির মতো। এর মধ্যে ১৫টিতে জরিপ চালানো হয়। ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এসব দোকানের প্রায় ১২ হাজার কেজি চাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের গড় মূল্য দুই হাজার টাকা হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৬ লাখ টাকা। আর বস্তা কাটার কারণে ক্ষতি ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ওই বাজারগুলোতে মুদি দোকানের সংখ্যা ২ হাজারের উপড়ে। এর মধ্যে জরিপের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে ২৭ টি দোকান। এসব দোকানে বছরে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার পণ্য ইঁদুর বিনষ্ট করে।
একইভাবে পশু খাদ্যের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, ঔষুধের দোকান, কাপড়ের দোকান, বিপণি-বিতান ও বাসাবাড়িতে ইঁদুরের আক্রমণে লাখ লাখ টাকার পণ্য, বইপত্র, আসবাবপত্র বিনষ্ট হয়। পাঁচটি হোটেলে বছরে ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায় ৮৫ নহাজার টাকা।
জানা গেছে, রূপগঞ্জে ছোট-বড় প্রায় ৩৫৬টি পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে। ইঁদুর এসব মুরগির খামারে গর্ত করে মুরগির ডিম ও ছোট বাচ্চা খেয়ে ফেলে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ইঁদুর প্রতিটি মুরগির খামারে বছরে ১৮ হাজার টাকার ক্ষতি করে। সে হিসাবে ৩৫৬টি খামারে বছরে ইঁদুর বিনষ্ট করে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ পোল্ট্রি খামারি সোলায়মান মিয়া বলেন, ইঁদুরের কারণে প্রতি মাসেই ক্ষতি হয়। ইঁদুর মুরগির বাচ্চা ও ডিম খেয়ে ফেলে। এতে বছরে ১৫ হাজার টাকার মতো ক্ষতি হয়।
এদিকে, ইঁদুরের কারণে প্লেগ, জন্ডিস, টাইফয়েড, চর্মরোগ, রিকেটস, আমাশয়, জ্বর, কৃমিসহ প্রায় ৬০ ধরণের রোগজীবাণু ছড়ায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভী রহমান বলেন, ইঁদুরের কারণে প্লেগসহ নানা ধরণের রোগ ছড়ায়। তবে ইঁদুর কামড় দিলে উচিত টিটেনাস ইনজাঙ্কশন প্রয়োগ করা। নতুবা বিপদ থাকতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফাতেমা নূর বলেন, ইঁদুরের কারণে বছরে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ কারণে কৃষি অফিসের উদ্যোগে সচেতনতা বাড়াতে নারী-পুরুষের মাঝে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। আগের চেয়ে এখন ইঁদুরের উপদ্রব কিছুটা কমে এসেছে।









