- উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বগুড়া
- প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত আট প্রকল্পের মধ্যে দুটির বাস্তবায়ন, বাকি প্রকল্পে কচ্ছপগতি
বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে
- মাহফুজুল ইসলাম রাজ, সিনিয়র সহ-সভাপতি, বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
জেলায় বিমানবন্দরসহ অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল স্থাপন অতীব জরুরি
- প্রফেসর ড. হোসনে আরা বেগম, নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস
উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত এক সময়ের শিল্পের শহর বগুড়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন থমকে গেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতির অর্থনৈতিক জোন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর চালুর কথা থাকলেও আজও চালু হয়নি। বগুড়া থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত রেললাইন সংযোগ প্রকল্পটিও চলছে কচ্ছপগতিতে। দুই দশক আগে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আর মাঝারি শিল্প স্থাপনে যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল নানা কারণে এখন তা ভাটার পথে। শুধু কৃষি যন্ত্রপাতি ও হালকা প্রকৌশলশিল্পের সম্প্রসারণের আত্মতৃপ্তি নিয়েই থাকতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কিংবা পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন বগুড়াবাসী। বগুড়া থেকে দ্রুত ও কম সময়ে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো আগ্রগতি হয়নি। নানা জটিলতায় থমকে গেছে উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় সব ধরনের উয়ন্নয় কর্মকাণ্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত বগুড়ার আটটির মধ্যে ছয় প্রকল্পের কাজ। ছয় বছরেও প্রকল্পগুলোর কাজ দৃশ্যমান হয়নি। এতে ক্ষোভ বাড়ছে জেলাবাসীর মধ্যে।
উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্ব জেলা বগুড়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতি হারানোয় তা নিয়ে প্রতি পদে পদে জবাবদিহি করতে হচ্ছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের। সরকারদলীয় নেতারা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাগিদ দিয়েও ফল পাচ্ছেন না। বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক কারণে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছেন জেলার সাধারণ মানুষ। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে উন্নয়ন বৈষম্য মানায় না। তাদের মতে, এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য দ্রুতই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হওয়া দরকার।
জাতীয় নির্বাচনের আগে বিগত ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বরে বগুড়ায় আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে বগুড়া হয়ে রংপুর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ আটটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। কিছু প্রকল্প ফাইলবন্দী হয়ে আছে। কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চিঠি চালাচালি পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত শুধু মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে বার্ন ইউনিট স্থাপন ও প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। অন্যসব প্রকল্পের মধ্যে যমুনানদীতে ড্রেজিং, মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে বার্ন ইউনিট স্থাপন, বগুড়া শহর থেকে মেডিকেল কলেজে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ, ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ আজও শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য শাজাহানপুর উপজেলার বগুড়া-নাটোর সড়কের পাশে জমি দেখলেও অধিগ্রহণ পর্যায়ে একটি জমির মূল্য কম হওয়ার কারণে আদালতে মামলা হয়। যাতে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া থমকে যায়। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পাওয়া বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। পাশের জেলা নওগাঁয় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হলেও বগুড়ায় প্রতিশ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ না নেয়ায় জেলাবাসীর মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তেমন দৃশ্যমান নয়। এসব কারণে যেমন চাপে পড়েছেন সরকারদলীয় নেতারা, তেমনি বিরোধিরা সুযোগ বুঝে সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
জানতে চাইলে দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. হোসনে আরা বেগম দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা বগুড়া। অর্থনৈতিকভাবে এ জেলার গুরুত্ব অনেক বেশি থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ব্যবসায়ীদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় দেশের উন্নয়নে এ জেলা আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারছে না। টিএমএসএসের এই প্রতিষ্ঠাতার মতে, জেলায় বিমানবন্দরসহ অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল অতীব জরুরি। জেলায় শিল্পন্নোয়নে অনেক সুযোগ রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলির দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহফুজুল ইসলাম রাজ দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলি যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, জেলায় তত বেশি অর্থনৈতিক পরিবেশের বদল ঘটবে। উদ্যোক্তা আর ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিল্পস্থাপনের সুযোগ বাড়বে।
বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক বেলাল হোসেন তালুকদার দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, বর্তমান সরকারের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। বগুড়ায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের বাড়ি হওয়ায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ জেলাকে ব্ল্যাক লিস্টে রেখেছেন। তিনি মুখে সব জেলার সুষম উন্নয়নের কথা বলেন। তবে বগুড়ায় তার কোনো প্রমাণ নেই। তিনি প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলির দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি করেন।
জানতে চাইলে বগুড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি রফি নেওয়াজ খাঁন রবিন দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্য প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন হবেই। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে একদিকে এ অঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে যাবে, অন্যদিকে মানুষ সাচ্ছন্দে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পস্থাপন করে লাভবান হতে পারবেন। বেকার সমস্যার সমাধান হবে।
আনন্দবাজার/শহক









