পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে রাজস্ব ফাঁকি। এই তালিকায় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৃহৎগুলোও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। সামান্য ফাঁক ফোকরে হাতিয়ে নিচ্ছে জনগনের দেয়া অর্থ, যেটা সরকারি কোষাগারে জমা হবার কথা। সেই অর্থ সরকারকে না দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তেমনি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে ওঠেছে দেশীয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলসের বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানটি ৭০ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বিক্রয় গোপন করে। এই গোপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির দিয়েছে বলে প্রমান পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট গোয়েন্দা। এনিয়ে ভ্যাট ফাঁকির একটি মামলাও দায়ের হয়েছে। বুধবার ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ‘রানার অটোমোবাইলসের প্রধান কার্যালয় তেজগাঁও। যা ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ০০০৪০৭৬৬৮-০২০৩। কারখানা প্যারাগন (বারচালা), ময়মনসিংহ। যা ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ০০০৪০৭৫৬২-০১০৩।
বিক্রয় তথ্য গোপন করে ২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির প্রসঙ্গে রানার অটোমোবাইলসের সচিব মিজানুর রহমান বলেন, ভ্যাট গোয়েন্দারা রানার অটোমোবাইলসের প্রধান কার্যালয় তেজগাঁওতে এসেছিল। সেই সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েছে। কিন্তু ভ্যাট ফাঁকির বিযয়ে কিছু বলেননি। এরপর কোম্পানির পিআরের কাছে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর একই প্রসঙ্গে কোম্পানির পিআর ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, ভ্যাট ফাঁকি বিযয়ে আমি কিছু জানি না। সম্প্রতি ভ্যাট গোয়েন্দারা এসেছিলেন। তেজগাও অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গেছে। যাচাই বাছায়ের পর কি হয়েছে, সেটা এখনও জানি না। তাই বিক্রয় তথ্য গোপন বা ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ বিযয়ে কিছু বলতে পারবো না। ভ্যাট ফাঁকির ব্যাপোর কোনো মামলা হয়েছে কিনা, সেটাও বলতে পাচ্ছি না।
মইনুল খান বলেন, এক ক্রেতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ ভ্যাটের সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে রানার অটোমোবাইলসের প্রধান কার্যালয় তেজগাঁওতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে দেখতে পায়, প্রতিষ্ঠানটি মাসিক দাখিল পত্রে প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৭০ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ভ্যাটযোগ্য বিক্রয় গোপন করে। এই গোপনের মাধ্যমে ২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেয় বলে প্রমাণ মেলে।
পরিদর্শন শুরুতে যাচাই বাছায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সংক্রান্ত ও বাণিজ্যিক দলিলাদি চান এনবিআর কর্মকর্তারা। পরে রানার অটোমোবাইলসের সিএফও শনদ দত্ত ভ্যাট কর্মকর্তাদের চাহিদা অনুসারে কাজপপত্র দেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মূসক ফাঁকির আলামত থাকায় ওই সময় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত কিছু বাণিজ্যিক ও মূসক সংশ্লিষ্ট দলিলাদি জব্দ করা হয়। এসব তথ্য ভ্যাট দলিলাদির সাথে ব্যাপক অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়।
তদন্ত অনুসারে, ২০১৬ সালে জুলাই হতে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৮৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮১ হাজার ৮১৭ টাকার পণ্য বিক্রি করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি মাসিক রিটার্নে ১ হাজার ৭৬৪ কোটি ২ লাখ ৩৩ হাজার ১৫৬ টাকা বিক্রয় হিসাব প্রদর্শন করে। রিটার্ন ও প্রকৃত বিক্রয়ের পার্থক্য পাওয়া যায় ৭০ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৬১ টাকা। বিক্রয় তথ্য গোপন করায় ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৬ টাকা ভ্যাট ফাঁকি হয়। এই ফাঁকির উপর ভ্যাট আইন অনুসারে মাস ভিত্তিক ২ শতাংশ হারে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার ৩৯৫ টাকা সুদসহ মোট ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭১ টাকা দাঁড়ায়।
তদন্তে পরিহারকৃত ভ্যাট আদায়ের আইনানুগ পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটে প্রেরণ করা হয়। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি সেবা প্রদানের বিপরীতে মূসক চালান যথাযথভাবে প্রদান করছে কিনা তা সংশ্লিষ্ট মূসক সার্কেল ও বিভাগীয় অফিস হতে তদারকি জোরদার করার জন্যও অনুরোধ করা হয়।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, রানার অটোমোবাইলস একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এর অধীন ১টি কারখানা, ১টি বাণিজ্যিক আমদানিকারক এবং একাধিক শোরুম রয়েছে। বাণিজ্যিক আমদানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেল এবং থ্রি হুইলার আমদানি করে কোনরূপ পরিবর্তন না করে গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করে থাকে। কারখানা হিসেবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেল সিকেডি অবস্থায় আমদানি করে তা সংযোজন করে সরবরাহ করে। কারখানা হতে তিন ধরনের গ্রাহকের নিকট বিক্রয় করা হয়। এরা হলো- করর্পোরেট গ্রাহক, ডিলার এবং নিজস্ব শোরুরম।
উল্লেখ্য, রানার অটোমোবাইলস লিমিটেড ২০০০ সালের জুলাইয়ে প্রাইভেট লিমিটেড হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। মোটরসাইকেলের আমদানিকারক এবং ব্যবসায়ী হিসাবে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে পাবলিক লিমিটেড হিসাবে রূপান্তরিত হয়। পরে মোটরসাইকেলের উৎপাদন ও বিক্রয় ব্যবসা শুরু করে। এরপরে ইঞ্জিন একত্রিত করার এবং মোটরসাইকেলের অন্যান্য অংশগুলি তৈরির সুবিধা স্থাপন করে। রানার্স মোটরসাইকেলের পরিসীমা ৮০ সিসি থেকে শুরু করে ১৫০ সিসি পর্যন্ত এবং প্রায় ১২টি মডেল রয়েছে। ভালুকায় রানার অটোমোবাইলসের নিজস্ব কারখানায় চারটি সিরিজের বারোটি মডেল উৎপাদন করে। প্রতিদিন মোটর সাইকেল উৎপাদন সক্ষমতা ৫০০টি। রানার একটি প্রস্তুতকারক হিসাবে বিশেষত পণ্য বিকাশ এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রগুলিতে তার গবেষণা এবং বিকাশ সুবিধাগুলি বাড়াচ্ছে।









