কক্সবাজারে দ্রুত বাড়ছে মৃত্যু-আক্রান্তের সংখ্যা
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ কক্সবাজারে। ঢাকার পর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হটস্পটে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গা শিবির ও কক্সবাজার জেলা শহর। পাশাপাশি মানুষে মানুষে গিজ গিজ করা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। গত ১০ মাসে জেলায় ২৭ রোহিঙ্গাসহ মারা গেছেন ৩৩ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে ১৪ হাজার ১০০ রোহিঙ্গা নাগরিক। স্থানীয় ১ হাজার ৫০০ জন।
কক্সবাজার সদরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭শ’ থেকে ৮শ’ জন রোগী ভর্তি থাকেন জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তার উপর রোহিঙ্গা রোগী আসে গড়ে ৩শ থেকে ৩শ ৫০ জন। এর বাইরে ডেঙ্গু ব্লক খোলা হয়েছে আলাদা। জেলার ২৪ লাখ লোকের প্রধান আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র হলো এ হাসপাতাল। বিশেষ করে গরীব রোগীদের অন্যতম আশা ভরসার কেন্দ্র কক্সবাজার সদর হাসপাতাল। এর বাইরে ১৩ লাখ রোহিঙ্গার চাপ, সবমিলিয়ে ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে সরকারি এ হাসপাতালে। চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এদিকে তারপর ও স্বাস্থ্য সচেতনদের দাবি, মশক নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া ও যত্রতত্র প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে।
জানা যায়, চলতি মাসে সদর হাসপাতালে ৫৬জন ও উপজেলার স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোতে ৩৬৭জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আক্রান্তরা সেখানকার এনজিও পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. আশিকুল রহমান বলেন, যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনায় সয়লাব থাকায় এডিস মশার উৎস বাড়ছে। মশা নিধনে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অর্থাৎ ২২ অক্টোবর পর্যন্ত রোহিঙ্গাক্যাম্পে ডেঙ্গু মশার উৎপাত বেড়েছে ভয়াবহ আকারে। গেলো ১০ মাসে জেলায় মৃত ৩৩ জনের মধ্যে ২৭ জনই রোহিঙ্গা। এর মধ্যে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ২২ জন, ক্যাম্পের হাসপাতালে ১০ ও বসতবাড়িতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
সদর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্তদের কেউ বেডে, কেউ মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। করুণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা সেবা গ্রহনকারী কয়েকজন রোগী জানান, হাসপাতালেও মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ তারা। জ্বর, মাথা ব্যথাসহ নানা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। পরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে তাদের।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত কক্সবাজারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন সাড়ে ১৫ হাজার । এর মধ্যে রোহিঙ্গা রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার।
এদিকে, জেলায় ডেঙ্গুর স্পট হিসেবে জেলার কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলোবৈদ্যঘোনা, পাহাড়তলী, ঘোনার পাড়া বাদশাহ ঘোনা, ইসলাম পুর, কলাতলী আদর্শ গ্রাম, লারপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, টেকপাড়া, সমিতিপাড়া, নুনিয়ারছড়া, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ১০ থেকে ১৫ গ্রাম।
এছাড়া উখিয়া- টেকনাফের ক্যাম্প-৪, ক্যাম্প-৩, ক্যাম্প, ১০, ১১, ১৬, ৭, ৯, ২৫, ২৯, ৩২, ১/ইস্ট, ক্যাম্প-২৪, ২৬ ও ১৩। এসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণ হিসেবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ঘনবসতি ও যত্রতত্র প্লাস্টিক ব্যবহারকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
শহরের পাহাড় তলীর বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, ‘শহরের নালা-নর্দমায় জমে থাকা পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে এডিস মশার লার্ভা থাকলেও সেগুলো ধ্বংসের উদ্যোগ নেই পৌরসভার। যে কারণে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। এ ভাবে চলতে থাকলে ডেঙ্গু মহামারিতে রূপ নিতে পারে কক্সবাজারে।
নুনিয়া ছড়ার ব্যবসায়ী আবদুল ওদুদ হাসপাতালে ভর্তি আছেন দু’দিন ধরে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, প্রথমে জ্বর উঠেছিল। স্বাভাবিক মনে হওয়ায় গুরুত্ব দিইনি। যখন জ্বর বেড়ে যায় তখন চিকিৎসকের কাছে আসি। এরপর পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। টেকপাড়ার জসিম উদদীন বলেন, ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরি। মশার কামড়ে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হই। একপর্যায়ে বাসায় থাকতে না পেরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। গত চার দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। এতে ধরা পড়ে ডেঙ্গু।
সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জমানো পানির পরিমাণ বেশি। সেখানকার মানুষজন এডিস মশা নিয়ে সচেতন নন। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার না হওয়ায় ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান কারণ। ফলে পানি জমছে প্লাস্টিকে। সেখান থেকে এডিস মশার জন্ম হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, এত বেশী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার মূল কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গুর প্রকোপ একটু কমে আসছে। রোহিঙ্গাদের সচেতনতার পাশাপাশি ডেঙ্গুর আবাসস্থল ধ্বংসে কাজ করছি আমরা। খুব শিগগিরই ক্যাম্পে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো কমে আসবে।
কক্সবাজার অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, এত সংখ্যক মানুষের একসঙ্গে বসবাসের কারণে যা হবার তাই হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে বসবাস করা যায়না। তার চেয়ে বড় কথা হলো অতিরিক্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার আর ময়লা আবর্জনা। এতে পানি জমছে। সেখান থেকে মশার উৎপাত বাড়ছে। এসব এলাকা চিহ্নিত করে সচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে। আশা করা যায়, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে।
কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, দেশের অন্যান্য পৌরসভার চেয়ে কক্সবাজার পৌর শহর অনেক পরিচ্ছন্ন। প্রতিদিন টন-টন বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে নালা-নর্দমা। প্রতিদিন শহরে মশা নিধনে স্প্রে করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা দিনরাত কাজ করছে। তারপর ও যেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে সে সব এলাকায় মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত মাইকিং করে এডিস মশা ও ডেঙ্গু সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে।









