শিক্ষায় সহায়তা চান চা-শ্রমিকের সন্তানরা
ছোটখাট বিষয়েও দেখি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়, পদক্ষেপ নেয়া হয়। অথচ গত ১২ দিন ধরে চা শ্রমিকরা মাত্র তিনশ টাকার মজুরির জন্য খেয়ে না খেয়ে দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু এটা কারো চোখে পড়ে না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোনো আলোচনাই হয় না। অথচ আমরা প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক রয়েছি। চা-শ্রমিকদের ব্যাপারে রাষ্ট্র আর সরকারের অনীহার বিষয় তুলে ধরে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন চা-শ্রমিক দম্পতির ঘরে জন্ম নেয়া কেশব কৃষ্ণা শুভ নামে এক কলেজছাত্র। যিনি মৌলবীবাজারের শ্রীমঙ্গল কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শির্ক্ষার্থী। স্বপ্ন দেখেন ফ্রি লান্সিং করে অর্থ উপার্জনের।
চা-শ্রমিক বাবা ও রাবার শ্রমিক মায়ের ঘরে জন্ম নেয়া কেশব বলেন, আমার মা ভোর ৫টায় কাজে বের হন। রাবার বাগানে কাজ করেন। দৈনিক বেতন নামমাত্র। বাবা চা বাগানে কাজ করেন তারও বেতন একইরকম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য ও বস্ত্র এই পাঁচটি মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করার কথা সংবিধানে বলা হলেও আমাদের ব্যাপারে রাষ্ট্র উদাসীন।
কেশব বলেন, আমরা পড়ালেখা করতে সরকারি কোনো সহযোগিতা পাই না। বাগান মালিকরাও কোনো সহযোগিতা করেন না। স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে হলে গরু-ছাগল বিক্রি বা ঋণ করে টাকা দিতে হয়। সরকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা রাখলেও সেটি আমাদের ভাগ্যে জোটে না।
কেশব আরও বলেন, বাগানে কাজ করার সময় আমাদের অনেক লোকজন সাপের কামড়ে, বিচ্ছুর কামড়ে মারা যান। অসুখ হলে চিকিৎসা পান না। নিজের মায়ের চিকিৎসা বিষয়ে কেশব বলেন, একবার আমার আম্মার অসুখ হয়। কঠিন ডায়রিয়া। এই এলাকার অনেক মানুষই এই রোগে তখন আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে মাকে নেয়া হলে ডাক্তার বাইরে থেকে দুটি সেলাইন কিনে আনতে বলে। আমার ভাই পাঁচশ টাকা ঋণ করে সেলাইন আনলে সেটি শরীরে দেয়া হয়। অথচ আমাদের শ্রমিকদের এটি বিনামূল্যে দেয়ার কথা ছিল।
কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সবুজ বাওরি। নবম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় তার বাবার মৃত্যু হয়। নিজে রাজমিস্ত্রির কাজ করে পড়ালেখা করছেন। তার স্বপ্ন ব্যবসায়ী হবেন। তবে শঙ্কা, ব্যবসা করার মতো ঋণ কি পাবেন? সবুজ জানান, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় তিন হাজার টাকা লেগেছিল। এজন্য তার পরিবারকে গাছপালা বিক্রি করতে হয়েছে।
মদনমোহন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স শেষ করেছেন সঞ্চয় দাস। তিনি বলেন, শ্রমিক পরিবারে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বার্ষিক ৫ হাজার টাকা দেয়ার কথা শিক্ষা উপকরণ কেনার জন্যে। কিন্তু সেই টাকা আদৌ কেউ পায় না। শুধু শুধুই বলা হয়ে থাকে শ্রমিক পরিবারের জন্য বরাদ্দ। তিনি জানান, প্রতিটি বাগানে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়া দরকার। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে প্রয়োজন বিশেষ কোটা। কেননা চা শ্রমিকরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। আর শিক্ষায় চা বাগান কর্তৃপক্ষ ও সরকারি পর্যায় থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না।
মালিকদের দাবি, তারা দৈনিক ঘর ভাড়া বাবদ ৭৬.৯২ টাকা, চিকিৎসা বাবদ ৭.৫০ টাকা, ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ০.০২ টাকা এবং বাসাবাড়িতে উৎপাদিত ফলমূল বাবদ ১৪ টাকা শ্রমিকদের দেন। যা দাঁড়ায় ৯৮.৪৪ টাকা। সঞ্চয় দাস বলেন, শ্রম আইনের ২(৪৫) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা সুবিধা, অবসরভাতা বা ভবিষ্যৎ তহবিলে মালিক কর্তৃক দেয়া টাকা মজুরির অন্তর্ভুক্ত হবে না। ফলে মালিকরা খাতগুলিতে যে টাকা মজুরি বাবদ প্রদান করছে বলে দেখাচ্ছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আবার শ্রম আইনের ৯৬নং ধারায় স্পষ্ট নির্দেশ আছে চা শ্রমিকদের গৃহায়নের সুবিধা নিশ্চিত করবে মালিকরা। চা-শিল্প অন্য শিল্পের মতো নয়, যে বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কাজ করানো যায়। চা শিল্পের বিশেষ ধরনের কারণেই শ্রমিকদের বাগানেই থাকতে হয়। আর এই বাগানও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চাষ করছেন চা শ্রমিকরা। মালিক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু শ্রমিকরা সেখানেই আছেন। ফলে চা শ্রমিকদের গৃহে উৎপাদিত, কাঠাল বা পেঁয়ারা জাতীয় ফলের মূল্য মজুরিতে দেখানো হাস্যকর যুক্তি ছাড়া আর কি হতে পারে?
মালিকরা দাবি করছেন একজন শ্রমিককে সপ্তাহে ১০.৬১৫ কেজি চাল/আটা দেন। যার মূল্য ধরছেন ৩০.৭৯ টাকা। কিন্তু বাস্তব হলো একজন পুরুষ শ্রমিককে ৩.২৭০ কেজি রেশন দেন, তার পোষ্য নারী শ্রমিককে দেন ২.৪৪ কেজি, শিশুকে ১.২২ কেজি (যদি শিশু থাকে); এ সব মিলে হয় ৬.৯৩ কেজি। নারীরা পোষ্যের জন্য রেশন পান না। কোনো কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকলে রেশন কাটা হয়।









