-
মনিটরিং সেল গঠনে হাইকোর্টে আবেদন
- তিন মাস ভ্যাট প্রত্যাহার
- ১৫ দিন পর পর দাম সমন্বয়
- বাজার মনিটরিংয়ে এফবিসিসিআই সেল
- দেশে ভ্যাট ১৫ ভাগ, ভারতে ৫
বাজারে তেলের কোনো সংকট নেই। তবে সামনে দাম বাড়বে- এমন মনে করে অনেকেই মজুদ করছেন: বিশ্বজিৎ সেন, প্রতিনিধি, সিটি গ্রুপ
কয়েকজনের জন্য সব ব্যবসায়ীর দায় নিতে হয়। যারা ব্যবসার নামে অন্যায়-বাটপারি করবে আমি তাদের নেতা না: সভাপতি, এফবিসিসিআই
দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে অন্যতম পণ্য সোয়াবিন তেলের বাজারে বেসামাল অবস্থা। অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মনিটরিং সেল গঠন এবং নীতিমালা তৈরি করতে হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত হয়েছে। যদিও সরকার এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন বাজারে সরবরাহের কোনো সংকট নেই। এমন পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল করতে আগামী তিন মাস সোয়াবিন তেলে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)।
গতকাল সোমবার মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে ‘ভোজ্যতেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। সভায় সোয়াবিন তেলের বর্তমান অস্থির বাজার পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও সরবরাহকারী এবং পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সূচনা বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে সেটা আসতে আসতে দুই মাস পর দাম বাড়ার কথা। কিন্তু সাথে সাথেই কেন দাম বাড়বে? ব্যবসায়ীদের এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যারা ব্যবসার নামে অন্যায় করবে, বাটপারি করবে আমি তাদের নেতা না।’ কয়েকজনের জন্য সব ব্যবসায়ীদের দায় নিতে হয় বলেও অভিযোগ করেন দেশের ব্যবসায়ীদের সর্ববৃহৎ সংগঠনের এ নেতা।
তাছাড়া সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভার উদ্ধৃতি দিয়ে মো. জসিম উদ্দিন জানান, সরকারি হিসাব মতে রমজান পর্যন্ত চাহিদার তুলনায় কোনো ঘাটতির তথ্যও নেই। সে হিসেবে দাম বাড়ার কথা না। প্যাকিং তেলের চেয়ে খোলা তেলের দাম বেশি জানিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে প্রয়োজনে খোলা তেল বন্ধের আহ্বান জানান।
দেশে একসময় ২০ থেকে ২৫টি প্রতিষ্ঠান সোয়াবিন তেল আমদানি করলেও এখন মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান তেল আমদানি করে থাকে। আলোচনায় অংশ নিয়ে আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপের প্রতিনিধি তসলিম শাহরিয়ার বলেন, আমরা ১১৮০ ডলারে তেল আমদানি করতাম এখন সেটা ১৯০০ ডলারে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে ৬১ শতাংশ। এসময় এফবিসিসিআই সভাপতি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, এখন যে দাম বেড়েছে সে দামে তো তেল দেশে আসে নাই। সুতরাং বিভ্রন্তি না ছড়িয়ে সর্বশেষ কত দামে আমদানি করেছেন সেটা বলুন। পরে তাসনিম জানান, সর্বশেষ ১৩৫০ ডলারে আমদানি করা হয়েছিল। তবে ভারতে ভ্যাট ৫ শতাংশ হলেও দেশে ভ্যাট ১৫ শতাংশ হওয়ায় দাম বেড়ে যায় বলে জানান এ আমদানিকারক।
সভায় আরেক আমদানিকার সিটি গ্রুপের প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ সেন বলেন, কৃত্রিম সংকটের কথা বলা হচ্ছে, আসলে তা না। বাজারে কোনো সংকট নেই। তবে সামনে দাম বাড়বে এমন মনে করে অনেকেই মজুদ করছেন। এমন কুরবানি পর্যন্ত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে জানান তিনি। আরেক আমদানিকারক প্রতষ্ঠিান এস আলম গ্রুপের কাজী সালাউদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার ফলে দাম বাড়বেই। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সমন্বয় করলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।
টি কে গ্রুপের প্রতিনিধি শফিউল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে অথচ দেশে তিন-চার মাস পর পর দাম সমন্বয় করা হয়। দেশে যাতে সংকট না হয় সে জন্য আমরা ১৮৭০ ডলারে এখন এলসি করছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারত-চীন আমদানি বাড়াচ্ছে, আমাদেরও প্রস্তুতি দরকার। প্রতি লিটারে সরকার ২৫-২৬ লাভ করছে। দুই-তিন মাসের জন্য এটা না করলে সংকট থাকবে না। রূপচাঁদা কোম্পানির প্রতিনিধি বলেন, নিয়মিত দাম সমন্বয় করে নিলে আজ এ পরিস্থিতি হতো না।
পাইকারী ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, ১৪৯ টাকা পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক মিল সরবরাহ করছে না বা দেরি করছে। সরবরাহ ঠিক রাখলে বাজার নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এসময় বিভিন্ন স্থানে অভিযান নিয়ে অসন্তুষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মনে হচ্ছে তেল নিয়ে কেয়ামত হয়ে যাচ্ছে।
পুরান ঢাকার ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শেখ বশীর উদ্দীন বলেন, মিল থেকে তেল ১৮ দিন পরেও সরবরাহ করা হয়েছে। ট্রাক এতোদিন করাখানায় ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। আমদানি প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ ঠিক রাখলে কিছুটা হলেও বাজার সরবহার ঠিক থাকতো বলেও জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।
মতবিনিময় সভায় দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রতি ১৫ দিন পর পর যেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম সমন্বয় করে। এতে প্রয়োজনে দাম বাড়বে বা কমবে। ব্যবসায়ীরা শুধু সরবরাহ ঠিক রাখবে। এসময় দেরিতে দাম সমন্বয়কেই সমস্যা বলেও উল্লেখ করেন এক প্রতিনিধি।
ব্যবসায়ীদের মতামত শুনে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মিডিয়ায় যতটা বলা হচ্ছে আলোচনা শুনে মনে হচ্ছে সংকট ভয়াবহ না। দাম সমন্বয় করার ক্ষেত্রে এফবিসিসিআই কাজ করবে জানিয়ে দাম বাড়বে সে প্রত্যাশায় পণ্য আটকে না রাখার অনুরোধ জানান। বাজার মনিটরিং করতে এফবিসিসিআই নিজস্ব একটি সেল গঠন করবে বলেও জানান তিনি।
বিশ্বের সব মুক্ত অর্থনীতরি দেশেও ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয় জানিয়ে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের এখানে বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছে। অনেক দেশেই উৎসব দিবসগুলোতে কম দামে পণ্য বিক্রি হলেও আমাদের দেশে রমজানে-ঈদে উল্টো চিত্র দেখা যায় বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দেশে সবাই মজুদ করা শিখে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সমাপনী বক্তব্যেও এ ব্যবসায়ী নেতা খোলা তেল বিক্রি বন্ধের কথা বলেন। ৫ গ্রামের স্যাম্পুর প্যাকেট হতে পারলে ১০০ বা ২০০ গ্রামের তেলের প্যাকেটও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযানের উদ্ধৃতি দিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ছোট বিক্রেতা দেখলাম ৫০০/৭০০ লিটার মজুদ করে রাখছেন। এটা কেন হবে? সরকার নির্ধারিত দাম পরিপালনের আহ্বান রেখে তিনি সরবরাহ ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান। সরকার এবার বিষয়টি শক্তভাবে দেখছে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমরা চাই না কোনো ব্যবসায়ী লজ্জিত হোক। মানুষকে গিনিপিগ করতে দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে সরকারি মূল্যে প্রতিলিটার খোলা তেলের পাইকারী মূল্য ১৪০ টাকা আর খুচরা মূল্য ১৪৩ টাকা। তবে ২ মার্চ বাজারে ক্রেতাদের কাছ থেকে এক লিটার খোলা সয়াবিনের দাম ১৭৫ টাকা হয়েছে বলে হাইকোর্টে রিট করা হয়ছে। অন্যদিকে বোতলজাত তেলের মূল্য ধরা হয়েছে। ১৬৮ টাকা। যেখানে সরকার ভ্যাট হিসেবে পাচ্ছে ৩০ টাকা, ১০ টাকা কমিশন আর বোতলের দাম পড়ছে ১৫ টাকা। ফলে ব্যবসায়ী ১ লিটার তেলে দাম পাচ্ছেন ১১৩ টাকা।
তেল আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী কোম্পানি, পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজেটে ভোজ্যতেলে ভ্যাট ধরা হয়েছিল ৯ টাকা। অথচ সরকার এখন প্রতি লিটারে ভ্যাট নিচ্ছে ২৭ থেকে ৩০ টাকা।









