রংপুরের বাজারে উঠতে শুরু করেছে ৪৫ থেকে ৫০ দিন জীবনকালের আগাম আলু। আগাম আলু চাষের এলাকা হিসেবে পরিচিত নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি জাতের আমন কাটার পর এ আলুর চাষ করেন। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আগাম আলু চাষ করলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আলুর দাম মিলছে না। এতে অনেকটাই হতাশ আলু চাষিরা।
উঠানে নতুন ধান আর মাঠে চলছে আগাম আলু পরিচর্যার কাজ। কৃষকদের দম ফেলার ফুসরত নেই। স্বল্পমেয়াদি জাতের আমন ধান কর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার চরাঞ্চলসহ রংপুর অঞ্চলে আগাম আলু রোপনের ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে সময়ের আগে আলু উত্তোলনকে ঘিরে যেন প্রানচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে মাঠজুড়ে।
কৃষি বিভাগ জানায়, রংপুর অঞ্চলে রবি মৌসুমের অর্থকরী ফসল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে আলু। এছাড়া রংপুরের গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলায় এক সময়ের পতিত থাকা তিস্তার চরে আলুর বাম্পার ফলন হচ্ছে। এ তিন উপজেলায় আলু চাষ হচ্ছে ২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। যার মধ্যে তিস্তার চরে প্রায় আট হাজার হেক্টর জমিতে আগাম আলু উৎপাদন হয়। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চর ছাওলা, চর তাম্বুলপুর, শিবদেব ও রহমত চর, গঙ্গাচড়ার ইছলী চর, শংকরদহ, জয়রামওঝা এবং কাউনিয়ার গদাই ও ঢুষমারার চর ঘুরে দেখা যায়, আগাম ও স্বল্পমেয়াদী জাতের আমন ধান কর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকরা আগাম আলু রোপন করেছেন।
জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরে বেশি মুনাফার আশায় নীলফামারীর কিশোগঞ্জের কৃষকরা আমন ধান কাটার পর শীতকালীন ফসল হিসেবে (রবি মৌসুম) আগাম আলুর চাষ করে থাকেন। এ আলু চাষের জন্য তারা স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের (১০০ থেকে ১১০ দিন জীবনকালের) আমন ধানের চাষ করেন। মাঠে মাঠে এখন প্রচলিত আমন ধানের কাটা-মাড়াই চলছে। অথচ কিশোরগঞ্জে আগাম ধান কর্তনের পর ওই জমিতে কৃষকরা আগাম আলু রোপন করেছেন। যে আলু বর্তমানে বাজারে উঠেছে। মৌসুমের শুরুতে বছরের নতুন এ আলু স্থানীয় বাজার ছেড়ে চলে যায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কৃষকরাও লাভবান হন। সে কারণে গত কয়েক বছরে উত্তরজনপদের আগাম আলু উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ। অন্য এলাকাতেও কিছু কিছু জমিতে আগাম আলু হলেও কিশোরগঞ্জের জমিগুলো উঁচু ও মাঝারি উঁচু হওয়ায় এখানে যেমন আগাম ধান হয়, তেমনি ধান কর্তনের পর ওই জমিতে রোপন করা হয় আগাম আলু। মৌসুমের শুরুতে আগাম এ আলু বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় কৃষকরাও লাভবান হন। এ পদ্ধতিতে একই মৌসুমে একই জমিতে কৃষকরা দুইবার আলু চাষ করতে পারেন।
সরেজমিনে কিশোরগঞ্জের মাগুড়া, রনচন্ডি ও বড়ভিটা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগাম ও স্বল্পমেয়াদী জাতের আমন ধান কর্তনের সাথে সাথেই কৃষকরা আলু ও বিভিন্ন শাকসবজির পাশাপাশি আগাম আলু ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যেন আগাম এ আলু উত্তোলনকে ঘিরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে এসব এলাকা। বড়ভিটা গ্রামের শাহিন মিয়ার ক্ষেতে রোপনকৃত আলু ক্ষেতের পরিচর্যা করছিলেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। সঙ্গে থাকা কৃষক শাহিন মিয়া বলেন, ‘আগাম আলু বাজারে তুলতে পারলেই ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হত। কিন্তু এ বছর দাম কম। ক্ষেত থেকে পাইকারি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ ওই এলাকায় আব্দুর রউফের তিন বিঘা, আব্দুল হামিদের দুই বিঘা, হাসেম আলীর তিন বিঘাসহ অনেকের আগাম রোপনকৃত আলু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন।
দক্ষিণ বড়ভিটা এলাকার কৃষক রেজাউল করিম জানান, তিনি তার দেড় বিঘা জমিতে ‘আলোড়ন’ নামে হাইব্রিড জাতের আমন ধান লাগিয়েছিলেন। ১০৭ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তিনি ধান কাটার পর জমি তৈরি করে ১১ অক্টোবর ‘সাগিতা’ জাতের আলু রোপণ করেন। যার জীবনকাল ৪৫ থেকে ৫০ দিন। এরপর ওই জমিতে দ্বিতীয় দফায় আলু রোপণেরও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি বছর কিশোরগঞ্জের নয় ইউনিয়নে রোপা আমন ধানের চাষ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান চাষ হয়েছে তিন হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। যার কর্তন শেষ হওয়ায় ওইসব জমিতেই লাগানো হয়েছে আগাম আলু।
সূত্র আরও জানায়, গত বছর উপজেলায় ছয় হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে আগাম আলু চাষ করা হয় তিন হাজার হেক্টরে। এ বছর আগাম আলু সাড়ে তিন হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে যাবে। রোপনকৃত আগাম আলু ৫০ থেকে ৬০ দিনের মাথায় উত্তোলন করে কৃষকরা ওই জমিতে দ্বিতীয় দফায় আলু চাষ করবেন









