- দেড় বছরে ৭৫৭ অনুমতিবিহীন মেলা
- মেলায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন
- বিপুল অঙ্কের রাজস্ব বঞ্চিত সরকার
টিএফজিআরসিপিআই-এর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুমতিবিহীন প্রায় ৭০০ ক্ষুদ্র মেলার বেশিরভাগই হয়েছে জীবন-জীবিকার তাগিদে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা জেলা প্রশাসনের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই চলছে নানা রকম মেলার আয়োজন। গত দেড় বছরে অনুমতিবিহীন প্রায় ৭৫৭টি মেলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রায় এক হাজার ৫৯ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করা হয়েছে। এ সময়ে সস্তা বাজার, হকার্স আনন্দ মার্কেট জাতীয় বিচিত্র নাম দিয়ে দেশে অন্তত সাতশ ক্ষুদ্র এবং ৫৭টি মাঝারি থেকে বৃহৎ পরিসরের মেলার আয়োজন করা হয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারি, আইনের প্রয়োগ না হওয়া এবং শিথিলতার কারণে এসব মেলা থেকে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
করোনাকালে ২০২০ সালে বিধি-নিষেধের বেড়াজালে বৈধ অনুমতির সুযোগ কমে আসায় মেলা বাণিজ্য নিয়ে দেশে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য মেলায় সরকারি নীতিমালার বাস্তবায়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাবিত ‘ট্রেড ফেয়ার গভর্মেন্ট রুল করাপশন এন্ড পাবলিক ইন্টারেস্টের (টিএফজিআরসিপিআই) পর্যবেক্ষণে গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত অনুমতিবিহীন প্রায় ৭০০ ক্ষুদ্র মেলার মধ্যে কয়েকটি বাদ দিলে বেশিরভাগই হয়েছে জীবন-জীবিকার তাগিদে।
টিএফজিআরসিপিআই-এর পর্যবেক্ষণে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৩ লাখ মাঝারি ও বৃহৎ মেলার সঙ্গে প্রায় দুই লাখ পরিবার সরাসরি মেলা ব্যবসায় জড়িত। এই দুই শ্রেণির ৫ লাখ পরিবারের প্রায় ২৫ লাখ পোষ্য প্রত্যক্ষ, আরো প্রায় ২৫ লাখ পরোক্ষ মিলে অর্ধ কোটি মানুষ মেলা বাণিজ্যের সুবিধাভোগী।
এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বৃহৎ অংশটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ প্রশাসনের নিম্নস্তরের কারো কারো সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে করোনাকালে প্রায় ৭০০টি ক্ষুদ্র মেলার মধ্য দিয়ে প্রায় ২০৪ কোটি টাকার অননুমোদিত ব্যবসা করেছেন। এতে অংশগ্রহণকারী দোকানদার এবং বিনোদন ব্যবসায়ীদের অধিকাংশেই ছিল খেয়ে পড়ে বাঁচার তাগিদ। এই শ্রেণির মেলা আয়োজকদের কেউ কেউ এসময়ে ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। অপরপক্ষে একই সময়ের শেষ ৬ মাসে আয়োজিত মাঝারি ও বৃহৎ আকারের মাত্র ৫৭টি মেলার ব্যবসায় প্রায় ৮৫৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আয়োজকরা ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যক্তি আয় করেছেন।
দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে এসব মেলার আয়োজকরা প্রচলিত বিধি-বিধান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রকে কৌশলে উপেক্ষা করেছেন। তারা বাণিজ্য মেলার আদলেই কেবল মাত্র সাইবোর্ডে নাম পাল্টে এসব বৃহৎ মেলার আয়োজন করেন। এ কাজে তারা পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র-কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের পরিপত্র অনুযায়ী ‘দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো স্থানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আয়োজিত মেলা যেকোনো নামেই আয়োজন করা হোক না কেন, যদি সেখানে প্রদর্শিত দ্রব্যাদি বিক্রয় বা বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকে তবে তা বাণিজ্য মেলা হিসেবেই গণ্য হবে।’
জানতে চাইলে বরিশাল, পিরোজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতিরা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির স্বার্থে চেম্বারসমূহের কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে সুস্পষ্টভাবে সব ধরনের বাণিজ্য মেলার এখতিয়ার জেলা চেম্বারসমূহকে দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন কারো মেলা করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চেম্বার অব কমার্সে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ এবং পুলিশ প্রশাসনের মতামত নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি নেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে পুলিশের মতামত নেয়া নয়, পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করেই পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) নামে এবং কোথাও বা বিসিকের নাম ব্যবহার করে এখতিয়ার বহির্ভুতভাবে বাণিজ্য মেলাগুলো চালানো হচ্ছে। এর কোনো কোনোটিতে অনৈতিকভাবে জুয়া খেলার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বরিশাল, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, হালুয়াঘাট, ফেনী ও বগুড়ার চলমান ১০-১২টিসহ উল্লেখিত ৫৭টি বাণিজ্য মেলার মধ্যে মাত্র ৩-৪টি মেলার আয়োজক ছাড়া অন্যরা চেম্বারসমূহকে আমলেই নেয়নি। এমনকি জেলা প্রশাসকেরও কোনো অনুমতি নেননি। ফলে জেলাসমূহের ব্যবসা বাণিজ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান চেম্বার অব কমার্স নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরম অসন্তোষ এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট চেম্বারগুলোও আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার।
জানতে চাইলে জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক মো. শরিফুল ইসলাম এবং গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, তারা পুনাকের নামে চলমান মেলার কোনো অনুমতি দেননি। গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দৈনিক আনন্দবাজারকে মেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম শান্ত পুনাকের নামে চলমান মেলাকে অবৈধ উল্লেখ করে এই আয়োজনের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, গাইবান্ধা চেম্বার মেলার জন্য আবেদন করেছিল কিন্তু আমাদের আবেদনটি করোনার কারণে প্রত্যাখাত হয়েছে।
জয়পুরহাট চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আহসান কবীর এপ্লব বলেন, আমরাও চেম্বারের পক্ষ থেকে আবেদন করলে করোনার অজুহাতে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ সেই করোনার পিক সময় থেকেই পুনাক হস্ত ও কুটির শিল্প মেলার আড়ালে বাণিজ্য মেলাই চালানো হচ্ছে। লালমনিরহাট চেম্বারের প্রেসিডেন্ট শেখ আব্দুল হামিদ বাবু পুনাকের মেলা বিষয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করেন।
দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মো. রেজাউল ইসলাম মিলন পুনাকের নামে বাণিজ্য মেলার আদলে মেলা আয়োজনকে চরম অনৈতিক উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, পুনাকের নামে বাণিজ্য মেলা আইনে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা আমার বোধগম্য নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন এইসব অনৈতিক কাজ অবিলম্বে বন্ধ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিন।
সিরাজগঞ্জ চেম্বারের প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ সূর্য বলেন, সরকারি নীতিমালা মেনে চেম্বারের পক্ষ থেকেই সিরাজগঞ্জের শিল্প ও বাণিজ্য মেলা আয়োজন করা হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী সিরাজগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন করেন। বরিশালে পুনাকের নামে আয়োজিত মেলাকে এফবিসিআই পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মো. নিজাম উদ্দিন ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে মেলা আয়োজকদের নেতৃত্বদানকারী মো. আমির হোসাইন দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, প্রায় ২ লাখ পরিবারের ১০ লাখ পোষ্যের জীবন-জীবিকা এই বাণিজ্য মেলা নির্ভর। করোনাকালে এদের অনেকেই দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করেছে। মেলা আয়োজকরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত না হওয়ায় অন্যান্য সেক্টরে সরকার প্রণোদনা দিলেও এই সেক্টরের সংশ্লিষ্ট লোকজন সেই সুযোগ পায়নি। তিনি মেলা আয়োজনের অনুমতি সহজ এবং অবাধ করার সঙ্গে সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানান।









