দেশের নদ-নদী আর বঙ্গোপসাগরের তলদেশের বালিতে বহু মূল্যবান খনিজ সম্পদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব খনিজের মধ্যে দুর্লভ কিছু মৌলও রয়েছে। যা আমাদের শিল্পখাতকে সমৃদ্ধ করছে। আনন্দবাজারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মঈনউদ্দিন আহম্মেদ।
জিএসবি মহাপরিচালক আরো বলেন, দেশে খনিজ সম্পদ (তেল ও গ্যাস ব্যতীত) অনুসন্ধান, আবিষ্কার, মূল্যায়ন ও ভূ-তত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করে যাচ্ছি আমরা। এর ফলে ভূগর্ভস্থ উন্নতমানের কয়লা, কঠিন শিলা, পিট, চুনাপাথর, সাদা মাটি, কাঁচবালি, ভারী খনিজ এবং মূল্যবান ধাতব খনিজের আকরিক আবিষ্কার হচ্ছে। এসব মূল্যবান সম্পদ দেশের জ্বালানি ও শিল্পখাতে অবদান রেখে যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিষয়ে জিএসবি মহাপরিচালক মঈনউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ভূতাত্ত্বিক, ভূ-পদার্থিক, খনন, ভূ-রাসায়নিক, মণিকতাত্ত্বিক ও অন্যান্য গবেষণালদ্ধ তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে বিস্তারিত ভূ-বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়ে থাকে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জ্বালানী সম্পদ বিভাগ পেট্রোবাংলা বিষয়টি সমন্বয় করছে।
নিজস্ব জনবল ও প্রযুক্তিতে প্রতিবছর ১৫ হতে ২০টি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে উল্লেখ করে মঈনউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এ পর্যন্ত চারটি কয়লা খনি আবিষ্কার করা হয়েছে। ২০১৩ সালে দিনাজপুরের হাকিমপুরে লৌহ খনিও আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে লোহার আকরিক মজুদ ৫ বর্গ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত। যা ভূ-পৃষ্ঠের নিচে প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিটার গভীরে। মজুদটির পূরুত্ব প্রায় ২০০ মিটার।
দেশে আবিষ্কৃত কয়লা দিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের একমাত্র তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে জানিয়ে জিএসবি মহাপরিচালক বলেন, এটি দেশীয় জ্বালানিতে ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে বাস্তবায়নযোগ্য বহিরাঙ্গণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা ও কালিগঞ্জ উপজেলার উপকূলীয় ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রায়ন ৫০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে।
জিএসবির আবিষ্কৃত কয়লার ধারণাকৃত মজুদ ১৬৪৬ মিলিয়ন টন। আর টনপ্রতি মূল্য ১৩০ ইউএস ডলার। এতে মোট আনুমানিক মূল্য ২১৩.৯৮ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এমন তথ্য দিয়ে মঈনউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, চুনাপাথরের মজুদ ২৫১৯২ মিলিয়ন টন। প্রতি টনের মূল্য ৩০ ডলার ও মোট মূল্য ৭৫৫.৫৫ বিলিয়ন ডলার। কঠিনশিলার মজুদ ১৫৫ টন, প্রতি টনের মূল্য ২০ ও মোট মূল্য ৩.১ বিলিয়ন ডলার। পিটের মজুদ ৫৯৯ মি.টন, প্রতিটনের মূল্য ৫০ ডলার ও মোট মূল্য ২৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার। সাদামাটির মজুদ ২৫৫ মি.টন, প্রতি টনের মূল্য ১৩০ ডলার ও মোট মূল্য ৩৩ বিলিয়ন ডলার। কাঁচবালির মজুদ ৫১১৭ মি.টন, প্রতি টন ৭ ডলার ও মোট মূল্য ৩৫.৮১ বিলিয়ন ডলার। নুড়িপাথরের মজুদ ২২০০ মি.টন, প্রতি টন ১২ ডলার ও মোট মূল্য ২৬.৪০ বিলিয়ন ডলার। লৌহ আকরিকের মজুদ ৬২৫ মি.টন, প্রতি টন ৯০ ডলার ও মোট মূল্য ৫৬.২৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে খনিজ সম্পদ সমূহের মোট আনুমানিক মূল্য ১১৫৪ বিলিয়ন ডলার বা সর্বমোট ৯৮০৯০ বিলিয়ন ডলার। শুধু এসবই নয়, জিএসবি ভারী খনিজ মণিক, ভারী খনিজ বালি এবং ধাতব খনিজের উপস্থিতি আবিষ্কার করেছে। প্রতিনিয়ত চলছে এসব কার্যক্রম।
জিএসবি মহাপরিচালক বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৩১ মার্চ বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩-৭৮ বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রথম পঞ্চশালা পরিকল্পনায় বলা হয়, এ দেশে খনিজ সম্পদের মধ্যে কয়লা, পাথর, চুনাপাথর, সাদাকাদা, গ্লাস সেন্ট, কঠিনশিলা, সৈকত বালু অন্যতম। তখন জামালগঞ্জে কয়লার মজুদ ধরা হয়েছিল ১৬০০ মিলিয়ন টন। আর এসব ১৯৮০ সালের আগে উত্তোলন করা যাবে না। জামালগঞ্জে ২০০ মিলিয়ন টন, জয়পুরহাটে ৩ মিলিয়ন টন, সিলেটের টেকের হাট ১.৮ মিলিয়ন টন। ময়মনসিংহের বিজয়পুরে সাদাকাদা রয়েছে শূন্য দশমিক ২ মিলিয়ন টন। রংপুরের রানীপুকুর এলাকায় প্রচুর কঠিনশিলা ও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বিচ সেন্ট।
আনন্দবাজার/শহক








