- পরিবেশবান্ধব স্বপ্ন বাংলাদেশের
- পাটে বিপদে ফেলেছে ভারত
প্লাস্টিকের কবলে পড়ে ধ্বংসের দিকে ছুটছে পৃথিবী। সাগর-মহাসগর, উর্বর মাটি, পানিসহ সব জায়গা ধ্বংস করছে প্লাস্টিক দূষণ। এমন ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচতে বিকল্প খুঁজতে বিশ্বনেতারা হয়রান হয়ে যাচ্ছেন। তবে ভয়াবহতার এমন বার্তার মধ্যেই আশা দেখাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ। পাট ও পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। প্লাস্টিককে হটিয়ে পাটের মাধ্যমে ব্যাপক আয় করা সম্ভব। এতে পৃথিবীও রক্ষা পাবে ধ্বংসের হাত থেকে।
জাতীয় পাট দিবস উদযাপন উপলক্ষে গতকাল রোববার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাটের এমন আশার আলো দেখিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, পাট ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল। এটি রপ্তানি করে মোঘল থেকে ব্রিটিশরা তাদের অর্থনৈতিক শক্তিকে বৃদ্ধি করেছে। তাদের রাজস্বের মূল উৎসও ছিল মসলিন, টাঙ্গাইলের শাড়ি ও পাট।
উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে কৃষিমন্ত্রী কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভারতের ২০ কোটি মানুষকে লর্ড ক্লাইভের ছল-চাতুরির কাছে পরাজিত হতে হয়েছিল। লর্ড ক্লাইভের কোম্পানিটি ছিল ব্যক্তিগত কোম্পানি। অথচ এটি ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানির আয় সমান হয়ে যায়। এই আয়ের ব্যাপক অংশই ছিল পাটের থেকে পাওয়া অর্থ। ২০০৪ সালে পাট উৎপাদন ছিল ১০ লাখ টন। সেখানে বর্তমানে ৯৩ লাখ টন। গ্রামের ৭০ ভাগ মানুষ কৃষিকাজে যুক্ত। এদের প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণ দিতে মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিকভাবে আমাদের এই জনপদ সোনালি আঁশের দেশ। সোনার দেশ, সোনার বাংলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৭ কোটি মানুষ সোনার বাংলা তৈরিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সকাল ৯টায় শোভাযাত্রার মাধ্যমে জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠান শুরু হয়। সকাল ১০টায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মূল আলোচনার আয়োজন করা হয়।
ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কুড়িগ্রামে মঙ্গা নেই। সেই সম্ভাবনায় পাটের কি ভূমিকার থাকবে? পাটপণ্য বাজারজাত করা যাচ্ছে না। কারণ ভারত এন্টি ডাম্পিং করে আমাদের রাজনৈতিকভাবে বিপদে ফেলছে। অথচ বর্তমানে পাটখড়ির কয়লায় কম্পিউটার প্রিন্টার ও ফটোকপিয়ার মেশিনের কালি, ট্যাবলেটের বাইন্ডার সিএমসি তৈরি হচ্ছে। পাট ও রেশমের সংমিশ্রণে তৈরি উন্নতমানের সূতা শিগগিরই যুক্ত হবে। জার্মানির গাড়িতে পাটের চিপ ব্যবহার হয়। বিশ্বের অভিজাত শ্রেণির মাঝে পাট গ্রহণীয় হবে। কেননা পাট দিয়ে অনেক সৌখিন জিনিস তৈরি হচ্ছে। পাটের দাম বাড়বে ব্যবহার বাড়লে। চাহিদা বেশি হলে দাম বাড়বেই। যোগান ঠিক রাখতে উৎপাদনে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ভারতের চেয়ে উৎপাদন বাড়াতেই হবে।
কৃষিমন্ত্রী পাটখাতের উন্নয়নে এসময় চারটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এগুলো হলো-
১. পাট রপ্তানিতে সরকার ২০ শতাংশ কৃষিতে প্রণোদনা/ভর্তুকি দেয়া হয়।
২. পাটে ১২ না ২০ শতাংশ প্রণোদনা/ভর্তুকি দেয়া হয়।
৩. কৃষি ও পাট মন্ত্রণালয় বসে সমস্যা চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করা।
৪. ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। বায়ো-টেকনোলজি দিয়ে ভারতের চেয়ে ভালো বীজ উৎপাদন হচ্ছে। আগামী ৩ বছর পর ভারত থেকে বীজ আনা হবে না।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রউফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বীরপ্রতীক, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মিজা আজম। গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, পাকিস্তানের মূল অর্থনীতি ছিল পাটখাতের। স্বাধীনতার পর কৃত্রিম সূতা উৎপাদন হওয়ার পর পাটের দুর্দিন শুরু হয়। পরবর্তীতে বেসরকারি ব্যবসায়ীরা এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখছে। পাটবীজ উন্নতমানে নেয়া ও সময় কমিয়ে আনতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে করে কৃষক পাটচাষে আগ্রহী হবে। বর্তমানে উবশী পাট চাষে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।
মূলত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় এটির উৎপাদন ও বিপণন বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন ২ হাজার টাকা মণের পাট ২৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একশ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে। প্রধান বাজার চীন। প্রত্যেকটি গাছ এক একটি ডলার। এ জন্য উৎসে কর কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে চিঠি দেয়া হবে। পাট থেকে আড়াই শতাধিক পণ্যসামগ্রী উৎপন্ন হয়। ১৫ শতাংশ হারে রপ্তানি বেড়েছে। তিনি বলেন, কৃষি ও পাট মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে পাটচাষের উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
পাট চাষে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। পাটের পর জমিতে যেকোন ফসল অধিকহারে হয়ে থাকে। পাট চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪ কোটি মানুষ জড়িত। পাটচাষিদের কল্যাণে সরকার ‘উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প দেশের ৪৬টি জেলার ২৩০টি উপজেলায় করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে উন্নতমানের পাট ও পাটবীজ উৎপাদনের কলাকৌশল বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, বিনামূল্যে পাটবীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রদান করা হয়ে থাকে। পাট পরিবেশবান্ধব ফসল হওয়ায় পাট ও পাটজাত পণ্য পরিবেশের কোন ক্ষতি করে না। ৭৫ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সোনালী আঁশ ও রূপালী কাঠি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
১৯৮৫ সালে কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় এখাতে ধ্বস নেমে আসে। কাঁচাপাট রপ্তানিতে শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও অনেক সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত হই। পাটশিল্পকে রক্ষা করতে বিজেএমসি, চা শিল্প, চামড়া শিল্প, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত হিমায়িত খাদ্যশিল্পের ন্যায় ব্যাংকের সমুদয় ঋণ মওকুফ করা এবং মেশিনারিজের আধুনিকায়নের ভারতে মতো ৩০ শতাংশ সাবসিডি ও স্বল্পসুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
পাট ও পাটজাত পণ্যে ১ বিলিয়ন ডলার (একশ কোটি টাকা) বৈদেশিক অর্থ আয় হয়েছে গত এক বছরে। আগামী বছরে এটি ২ বিলিয়নে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক বিলিয়নের ৭০ শতাংশই পাট সূতা। সংকটের কারণে বর্তমানে ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কেননা দেশের পাট বিক্রি বেশিরভাগই তুরস্ক। তবে সেখানে এর ৫টি বিকল্প প্রোডাক্ট দাঁড়িয়ে গেছে। কটন আমদানিতে উৎসে কর নেই অথচ দেশিয় কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনলে ২ শতাংশ কর দিতে হয়। এতে করে দেশের কৃষক ও ফরিয়াদের উপর প্রভাব পড়ে। ফলে কৃষক পাটের বীজ বিদেশ থেকে কিনে আনতে হয়।









